প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:০৮ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নারীর প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশে অশালীন শব্দ

অনলাইন ডেস্ক

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

নারীর প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশে অশালীন শব্দের যেন জুড়ি নেই। কতশত শব্দ যে ব্যবহার করা হয় নারীর মন ভেঙে দেওয়ার জন্য। সংসারে নারীর পান থেকে চুন খসলে তিরস্কার আর অকথ্য গালাগাল তো ফ্রি। অনাকাক্সিক্ষত, অমানবিক যেসব ঘটনা নারীর জীবনে আসে তা সহিংস ও গালিময় যা অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দুক্ষেত্রেই। এ ছাড়া রাস্তাঘাটে, বাসে, ট্রেনে, মঞ্চে বক্তৃতায় কারণে-অকারণে নারীর প্রতি বিদ্বেষ ছড়াতে গালাগাল তো আছেই। নারীদের প্রতি ঘৃণা, অবজ্ঞা, হিংসা বা বিদ্বেষমূলক ভাষা ব্যবহারের জন্য যেমন কোনো গবেষক হওয়া লাগে না, তেমনি চাইলেই যত্রতত্র নারীদের গালাগাল বা অকথ্য ভাষা প্রয়োগ করা যায়। এই নিপীড়ন নারীর শরীরে নারকীয় আক্রমণ না করলেও মনোজগতের সব সৃজনশীলতাই ভেঙে চুরমার করে ফেলে। হতে পারে সেটা নারীর চরিত্র সম্বন্ধীয়। হতে পারে তার বাবা-মা কিংবা তার কোনো আচরণ সম্বন্ধীয়। ‘ডাইনি’, ‘বেশ্যা’, ‘ছিনাল’, ‘খানকি’, ‘কুটনি’র মতো শব্দগুলো সব সময় নারীকে নেতিবাচকভাবে বর্ণনা করে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ঘটনার সঙ্গে নারীর ন্যূনতম সম্পর্ক না থাকলেও তাকে হেয় করে ‘জন্ম নেওয়া’ গালি ব্যবহৃত হতে থাকে বিনা সংকোচে যুগের পর যুগ।

এ ছাড়া রাস্তায়, রাজনৈতিক বক্তৃতায় বা ওয়াজ মাহফিলের মতো পাবলিক প্ল্যাটফর্মে নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক ভাষা একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় বা সামাজিক রীতির ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে নারীদের অবমূল্যায়ন করা হয়। কিছু ওয়াজ মাহফিলে নারীদের পোশাক, ঘরের বাইরে কাজ করা বা তাদের নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে কটূক্তি করা হয়। অনেক বক্তা নারীদের পুরুষের অনুগত থাকার জন্য চাপ দেন এবং অবাধ্যতার ক্ষেত্রে সহিংসতার পরোক্ষ সমর্থন দেন। রাজনৈতিক বক্তৃতায় অনেক সময় নারী নেত্রী বা কর্মীদের ব্যক্তিগত আক্রমণ বা লিঙ্গভিত্তিক গালিগালাজ করা হয়। এই ধরনের বিদ্বেষমূলক বক্তব্য সমাজে নারীদের প্রতি সহিংসতা এবং বৈষম্যকে বৈধতা দেয়।

রাস্তায় চলাচলের সময় নারীরা প্রায়ই শ্লেষাত্মক মন্তব্য বা ‘টিজিং’-এর শিকার হন। এই ‘উত্ত্যক্ত’ করার জন্য নির্দোষ কিছু শব্দ ব্যবহার করে যেমন- খাদ্যদ্রব্য, ফল, বাদ্যযন্ত্র, অস্ত্র এসব বিষয়কে বিকৃত অর্থে ব্যবহার করে নারীকে নিপীড়নের জন্য। যেমন- রসে ভরা কমলা, টাইট মাল, কচি ডাব, অ্যাটমবোম, মিষ্টি তেঁতুল, তানপুরা, গাড়ির চেসিস, ডবল ডেকার, গোলাপজাম, কোম্পানির মাল, মাগির গ্যারেজ বড়, কালনাগিনী, কাশবন, কচিমাল, ইন্ডিয়া গেট, জাম্বুরা, গোলাপি আপেল ইত্যাদি। এ শব্দগুলো নারীকে উত্ত্যক্ত করার জন্য ব্যবহৃত হলেও নারীর দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঙ্গে সাদৃশ্য করে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। যেটা যৌনতা, কামুকতা ও নোংরামিতে ভরপুর। নারীর জন্য এ বিষয়গুলো অপমানসূচক। এসব নারীদের চলাচলের স্বাধীনতাকে সীমিত করে।

যত্রতত্র নারীর প্রতি বিদ্বেষ বা গালাগাল করার পেছনে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক এবং কাঠামোগত কারণ কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। সমাজে দীর্ঘদিনের বদ্ধমূল ধারণা যে, পুরুষরা নারীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে। অনেক পুরুষ মনে করেন জনসমক্ষে নারীর উপস্থিতি বা তাদের স্বাধীন বিচরণ পুরুষতন্ত্রের জন্য হুমকি, যা তারা গালাগাল বা কটু মন্তব্যের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে চান। এ ছাড়া নারীকে একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে দেখার বদলে কেবল পণ্য বা ‘ভোগের বস্তু’ হিসেবে দেখার প্রবণতা জনসমক্ষে তাদের প্রতি সম্মানহানির বড় কারণ। অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় বা সামাজিক রীতির অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের পোশাক বা চলাচলকে লক্ষ্য করে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। বাংলাদেশে নারীর মর্যাদা রক্ষায় কঠোর আইন রয়েছে, কিন্তু অনেক সময় ভুক্তভোগীরা আইনি ঝামেলা বা সামাজিক সম্মানের ভয়ে অভিযোগ করেন না। আবার এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ব্যক্তি স্রেফ ‘মজা করার জন্য’ বা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য জনসমক্ষে নারীকে হেনস্তা বা গালিগালাজ করে। আশপাশের মানুষ যখন প্রতিবাদহীন বা নীরব থাকে, তখন অপরাধী নিজেকে নিরাপদ মনে করে এবং এই আচরণকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে করে।

যদিও জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল অনুসারে, এসব অনলাইন এবং অফলাইন উভয় ক্ষেত্রেই নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র নারী-পুরুষের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। ধর্মীয় সভায় উসকানিমূলক বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য মনিটর করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে। দণ্ডবিধির ৫০০ ও ৫০৯ ধারা অনুযায়ী জনসমক্ষে নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি অনুযায়ী নারীর প্রতি অবমাননাকর বক্তব্য বা সাইবার বুলিং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমন পরিস্থিতির শিকার হলে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন পেজে অভিযোগ এবং পুলিশের জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করা যায়। তবে এ সমস্যা সমাধানে কেবল আইন দিয়ে নয়, বরং পারিবারিক শিক্ষা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়