মো. মামুনুর রশিদ:
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার বিশ্বব্যাপী যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, তেমনি বাংলাদেশে এর অপব্যবহার ক্রমেই উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে ভুয়া ছবি, ভিডিও (ডিপফেইক) ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরিতে এআই এখন এক ভয়ংকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, নারীনেত্রী, ব্যবসায়ী ও জনপরিচিত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে এআই-নির্ভর ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে সামাজিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ডিজিটাল লিটারেসির অভাব এবং এআই প্রযুক্তি ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালার ঘাটতির কারণে এই অপব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে না পেরে ভুয়া তথ্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা দ্রুত কার্যকর আইন প্রণয়ন, প্রযুক্তিগত নজরদারি জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এআই প্রযুক্তির সুফল নিশ্চিত করতে হলে এর অপব্যবহার রোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এই প্রযুক্তিই ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এআই প্রযুক্তিতে নারীদের ঝুঁকি বেশি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহারে দেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারীরা। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তৈরি করা অশালীন, বিভ্রান্তিকর ও শ্লীলতাহানিমূলক কনটেন্ট নারীদের জন্য এক নতুন ধরনের সহিংসতার রূপ নিয়েছে, যা তাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে নারী নেত্রী ও সক্রিয় নারীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এতে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে এবং জনসমক্ষে অংশগ্রহণে অনীহা তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের কনটেন্ট নারীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
একশনএইড বাংলাদেশের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৬৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে অনলাইনে হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই শ্লীলতাহানিমূলক ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে নিপীড়নের সম্মুখীন হয়েছেন, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই-নির্ভর এই ধরনের কনটেন্ট শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে না, বরং সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করছে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাও বাড়িয়ে তুলছে। তারা মনে করেন, দ্রুত কার্যকর আইন প্রণয়ন, প্রযুক্তিগত নজরদারি বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল সচেতনতা জোরদার না করা হলে এই সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করবে।
সংশ্লিষ্টরা জোর দিয়ে বলেছেন, নারীদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ এখন অত্যন্ত জরুরি।
জাতীয় শোকেও এআই অপপ্রচার
গত ২১ জুলাই ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এলেও, এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা রিউমার স্ক্যানার এসব ভিডিও বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, এগুলো বাস্তব নয়; বরং গুগলের Veo AI টুল ব্যবহার করে তৈরি কল্পিত দৃশ্য। ভিডিওগুলোতে মাইলস্টোনের নামের বানানে ভুল, ভবনের গঠনগত অসামঞ্জস্য এবং নানা ধরনের ভুল তথ্য লক্ষ্য করা গেছে, যা এগুলোর ভুয়া হওয়ার প্রমাণ বহন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সংবেদনশীল ও শোকাবহ মুহূর্তে এ ধরনের ভুয়া কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়া জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক ও অবিশ্বাস তৈরি করে। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত তথ্য আড়ালে পড়ে যায়, অন্যদিকে গুজব ও অপপ্রচার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় শোকের সময় এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, এই ঘটনাই তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। তারা এ ধরনের অপপ্রচার রোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, ফ্যাক্ট-চেকিং জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
আইন ও প্রশাসনে পদক্ষেপের ঘাটতি
সরকারি পর্যায়ে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে এখনও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে এআই অপব্যবহার রোধের নির্দেশনা আছে, তবে বাস্তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের ডিজিটাল লিটারেসি কম থাকায় এআই দ্বারা সৃষ্ট মিথ্যা কনটেন্ট সহজে বিশ্বাস করা হচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তুলছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘উন্নত বিশ্ব যেখানে এআই অপব্যবহার রোধে বিভিন্ন টেকনোলজিক্যাল ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে, আমাদেরও ভিজিল্যান্স টিম গঠন এবং পলিসি মেকারদের সক্রিয় ভূমিকা নেয়া উচিত। পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করতে হবে।’
লন্ডনভিত্তিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ শামীম সরকার বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই অপব্যবহার বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সহিংসতা ভয়াবহ মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ছে। আইনি নীতিমালা, ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম ও মিডিয়া লিটারেসি বাড়ানো ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।’
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া তথ্যের বিস্তার
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মেটা, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের ৮০ শতাংশ পোস্টই এআই রিকমেন্ডেশনের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে। বিগত ছয় মাসে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুল তথ্য ছড়ানোর হার প্রায় ২০০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বিরুদ্ধে কল্পিত তথ্য প্রচার এবং সামাজিক বিভাজন আরও তীব্র হচ্ছে।
ডিপফেক, সিন্থেটিক ভিডিও ও ভয়েস ক্লোনিং টেকনোলজির সহজলভ্যতায় সাধারণ মানুষ এখন এআই ব্যবহার করে বাস্তবের মতো কনটেন্ট তৈরি করতে পারছে। নির্বাচনের আগে এ ধরনের কনটেন্টের মাধ্যমে ডিজিটাল সহিংসতা ও অপপ্রচার কয়েকশ গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে প্রযুক্তিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
আইন ও নীতিমালার ঘাটতি
বর্তমানে বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ আইন বা গাইডলাইন নেই। তথ্য প্রযুক্তি বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। প্রযুক্তিবিদরা মনে করেন, এআই-চালিত ভুয়া কনটেন্টকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে ডিপফেক শনাক্তকরণের জন্য উন্নত টুলস চালু করতে হবে। পাশাপাশি মনিটরিং টিম গঠন করে সোশ্যাল মিডিয়ায় কনটেন্ট নজরদারি করতে হবে।
অধ্যাপক মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘মনিটরিং না করলে অপতথ্য ছড়ানো বন্ধ হবে না। নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই সুরক্ষা দিতে হবে এবং জনবল নিয়োগ করে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।’
শামীম সরকার বলেন, ‘দেশে ফেসবুক, এক্স, ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে এআই কনটেন্টের ব্যাপকতা থাকা সত্ত্বেও রিমুভাল বা রেস্ট্রিকশন পর্যাপ্ত নয়। এ বিষয়ে সরাসরি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সরকারিভাবে আলোচনা প্রয়োজন।’
ভবিষ্যৎ ভাবনা ও করণীয়
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির যেমন রয়েছে বহুমুখী ইতিবাচক সম্ভাবনা, তেমনি এর অপব্যবহার রোধে এখনই বহুমাত্রিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
তাদের মতে, এ সংকট মোকাবিলায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত—
আইনগত কাঠামো প্রণয়ন ও তার কঠোর বাস্তবায়ন, উন্নত তথ্য যাচাই ব্যবস্থা ও ডিপফেইক শনাক্তকরণ প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তিতে পর্যবেক্ষণ টিম গঠন, জনগণের মধ্যে ডিজিটাল লিটারেসি ও মিডিয়া সচেতনতা বৃদ্ধি, এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার ধীরে ধীরে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা অপরিহার্য।
তাদের সতর্কবার্তা হলো, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনসহ দেশের সার্বিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রভাবিত হতে পারে এবং ডিজিটাল পরিসরে একটি গভীর সংকটের আশঙ্কা তৈরি হবে।