প্রকাশিত : ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৮:৩৮ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নিয়ন্ত্রণের বাইরে সাইবার অপরাধ: পাঁচ বছরে প্রায় ২ লাখ ভুক্তভোগী

মো. মামুনুর রশিদ:

নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে সাইবার অপরাধ। বাড়ছে অভিযোগ। বাড়ছে ভুক্তভোগী। অপরাধীদের কৌশলে বারবার প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা ডিবির তথ্য বলছে, পাঁচ বছরে দেশে সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে প্রায় ২ লাখ মানুষ অভিযোগ করেছে। চলতি বছর ডিবির হাতে জমেছে প্রায় ৫ হাজার অভিযোগ। বেশির ভাগ অপরাধীর টার্গেট অর্থ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ চলছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। সাইবার অপরাধ কমাতে সচেতনতা প্রয়োজন।

সিআইডির তথ্য বলছে, ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯৬ জন অভিযোগ করেছেন। ছয় মাসে সাইবার পুলিশ সেন্টারে যোগাযোগ করেছেন ৩ হাজার ৭৬৬ জন ভুক্তভোগী।

সিআইডির মুখপাত্র বিশেষ পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন গনমাধ্যমকে বলেন, সাইবার অপরাধের অভিযোগ প্রতিনিয়ত আসছে। অনলাইন ও ভেরিফায়েড পেজে পাওয়া প্রতিটি অভিযোগ যাচাই করে তদন্ত করা হচ্ছে।

ডিবিতে অভিযোগ দেওয়া ব্যক্তিদের তথ্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজধানীসহ সারা দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সাইবার চক্র স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসহ অর্থ চুরি করছে। ঊর্ধ্বতন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে মামলায় ফাঁসানো বা মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পুলিশের ইউনিফর্ম পরা ছবিও ব্যবহার করছে তারা। চলতি বছরের ১১ মাসে প্রায় ৫ হাজার সাইবার অপরাধের অভিযোগ পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।

পুলিশের সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার চক্র আগের চেয়ে অনেক বেশি সংঘবদ্ধ ও বেপরোয়া। অপরাধীরা প্রথমে টার্গেট ব্যক্তির স্মার্টফোনের কল ফরওয়ার্ডিং সেটিংস পরিবর্তন করে। এরপর মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের তথ্য বদলে ব্যবহারযোগ্য পাসওয়ার্ড নিজেদের নম্বরে নিয়ে নেয়। পরে টাকা তুলে নেয়।

সম্প্রতি দুর্জয় নামে সাইবার চক্রের এক সদস্য ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, সে বিভিন্ন নম্বর থেকে অপরিচিত ব্যক্তিদের ফোন করত। কথোপকথনের মাধ্যমে তথ্য নিত। এরপর আর্থিক প্রতারণা চালাত।

সিআইডি সূত্র বলছে, সাইবার অপরাধের শিকার ৩ হাজার ৭৬৬ ভুক্তভোগী গত ছয় মাসে সিপিসিতে যোগাযোগ করেছেন। ১ হাজার ৮১৩ জন অনলাইনে আর্থিক প্রতারণার শিকার হন। ৭৪৩ জন ই-কমার্সের মাধ্যমে প্রতারিত হন। ৫৪৪ জন ইনভেস্টমেন্ট ট্র্যাপে, ৬৪ জন লোনের ফাঁদে ও ১১৫ জন সেবা নিতে গিয়ে ট্র্যাপে পড়েন। ফ্রিল্যান্সিং কাজে ১৩ জন ও ১৭ জন এনআইডি ইস্যুতে আর্থিকভাবে সাইবার অপরাধের শিকার হন। ৮০২ জন পোস্ট, মেসেজ, ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে সাইবার অপরাধের শিকার হন। ব্যক্তিগত মিথ্যা তথ্যে ৬১ জন, ১২ জন ব্যক্তিগত তথ্য প্রচারে, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের ঘটনায় ২৮২ জন, ১৮৭ জন ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার, ১৬৫ জন সিম ক্লোন ও ২৬১ জন অন্যান্য সাইবার অপরাধের শিকার হন।  সিআইডি সূত্র বলছে, প্রতিটি অভিযোগের তদন্ত চলছে। ২ হাজার ৫৫২ জনের অভিযোগের বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করা হয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ। দেশ-বিদেশ থেকে অপরাধ হচ্ছে। এদের নিয়ন্ত্রণ করে ভুক্তভোগীদের সহযোগিতা করতে হবে।

আমেরিকান সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ম্যান্ডিয়ান্টের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে ৫৫ শতাংশ সাইবার হামলার উদ্দেশ্য ছিল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। বেসরকারি সংস্থা ব্লাস্টের উপপরিচালক তাপসী রাবেয়া বলেন, শহরের উচ্চশিক্ষিত অনেকেই অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এসব ভুক্তভোগীর ১৫-২৫ শতাংশই আইনের আশ্রয় নিতে চান না।

সম্প্রতি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক অনুষ্ঠানে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন জানায়, গত পাঁচ বছরে প্রায় ২ লাখ মানুষ সাইবার অপরাধের অভিযোগ করেছে, যা মোট ভুক্তভোগীর মাত্র ১২ শতাংশ।

জরিপে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের ৮০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছর। ৬০ শতাংশ নারী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তিও সাইবার অপরাধ বাড়াচ্ছে।  পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে সাইবার অপরাধের ৫৫ থেকে ৬৫ শতাংশই আর্থিক প্রতারণা। প্রতি বছর অপরাধের পরিমাণ ও ধরন দুটোই বাড়ছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়