মামুনুর রশিদ :
বাবুগঞ্জ উপজেলায় আলোচিত ও বিতর্কিত একটি মামলায় মাধবপাশা ইউনিয়ন তাঁতী দলের সাধারণ সম্পাদক এবং ইউনিয়ন যুবদলের সহ-সভাপতি সোহেল সরদার (৩৯) বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং দলীয় কোন্দলের শিকার হয়ে একজন নিবেদিত কর্মীকে কারাবরণ করতে হয়েছে। মামলার বাদী দেহেরগতি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন হেমায়েত। মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২১ নভেম্বর বাবুগঞ্জ থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়। এতে সোহেল সরদারকে ১১ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
মামলায় ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে বর্তমানে কারাবন্দি জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপুকে। তালিকায় আরও রয়েছেন বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনের সাবেক এমপি ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা এডভোকেট শেখ মো. টিপু সুলতান এবং ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে যুবমৈত্রীর তৎকালীন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আতিকুর রহমান। এ ছাড়া আরও ৮ জন আসামির মধ্যে একজন বিএনপির এবং বাকিরা আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মী বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। একইসঙ্গে নাম না থাকা আরও প্রায় দেড়শ জন এ ঘটনায় জড়িত ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
বাদী আনোয়ার হোসেন হেমায়েত অভিযোগ করেন, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আসামিরা জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের ঠাকুরমল্লিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র দখল করে লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দিয়েছেন। এ সময় বোমাবাজি, হামলা, মারধর এবং কুপিয়ে পিটিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের আহত করার অভিযোগও তোলা হয়।
অন্য আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিসেবে রয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সরদার খালিদ হোসেন স্বপন, সাবেক সভাপতি কাজী ইমদাদুল হক দুলাল, এবং মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী ফারজানা বিনতে ওয়াহাব-যারা তিনজনই বাবুগঞ্জের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান। মামলাটি ঘিরে বাবুগঞ্জ বিএনপির মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন-ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের অন্য ইউনিয়নের বাসিন্দা কীভাবে মামলার প্রধান বাদী হলেন? পাশাপাশি মামলার ৫ সাক্ষীর মধ্যে ৪ জনের বাড়িও অন্য এলাকায়, যেখানে ঘটনাস্থলে যেতে নদী পার হয়ে পৌঁছাতে হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাবুগঞ্জ বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির এক সদস্য বলেন, “বাবুগঞ্জ বিএনপিতে দীর্ঘদিন ধরে গ্রুপিং রয়েছে। বিরোধী গ্রুপকে কোনঠাসা করতে এবং তৎকালীন বাবুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ আমিনুল ইসলাম মোটা অংকের বিনিময়ে মামলা রেকর্ড করান বলে আমরা শুনেছি। এই হাস্যকর মামলাকে পুঁজি করে একটি পক্ষ বিরোধী গ্রুপকে পুলিশি হয়রানির মধ্যে ফেলেছে।”
স্থানীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে সোহেল সরদার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেনের সন্তান। তাঁর বড় ভাই সেলিম সরদার, বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য।
রাজনীতির পাশাপাশি সোহেল সরদার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে পরিবার চালাতেন। স্ত্রী, ছেলে জোবায়ের সরদার (১০) ও মেয়ে তাবাসুম (৫)-এই ছোট্ট পরিবার নিয়েই ছিল তাঁর সাজানো সংসার।
পারিবারিক সূত্র জানায়, মহামান্য হাইকোর্টের জামিনের শেষ দিন ১২ জানুয়ারি তিনি নিম্ন আদালতে হাজির হন। বিজ্ঞ আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাঁকে জেল হাজতে প্রেরণ করেন। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে সোহেল সরদারকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলেও নিশ্চিত করেছেন তাঁর বড় ভাই সেলিম সরদার। তিনি বলেন, “আমার ভাই দলীয় কোন্দলের শিকার হয়ে মিথ্যা ও হাস্যকর মামলায় জেল হাজতে। আমরা শুধু ভাইকে নিয়ে নয়-তার পরিবার নিয়েও চরম দুশ্চিন্তায় আছি। আমার মা ৭০ বছর বয়সী, দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে আক্রান্ত। সোহেল জেলে যাওয়ার খবর শুনে মা সারাক্ষণ কান্না করেন। ডাক্তার তাকে টেনশনমুক্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাবুগঞ্জ-মুলাদী আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন মাধবপাশা ইউনিয়নে গণসংযোগ করেন। তবে সোহেল সরদারের পরিবারের খোঁজ না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাবুগঞ্জ উপজেলা তাঁতী দলের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম আয়কর বার্তাকে বলেন, “সোহেল বিএনপির একজন নিবেদিত কর্মী। কিন্তু সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিনের আশেপাশে একটি সুবিধাবাদী গ্রুপ তাকে বেরিকেট দিয়ে রেখেছে। তাকে ভুল বুঝিয়ে নিবেদিত কর্মীদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জনসাধারণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।”
তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও দলীয় বিভাজনের বলি হয়ে একজন নিবেদিত কর্মী আজ কারাগারে। তাঁর পরিবার পড়েছে চরম অনিশ্চয়তায়। দ্রুত সোহেল সরদারের ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করে তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান তিনি।