প্রকাশিত : ১০ মার্চ, ২০২৬, ১০:৪৮ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সংসদে দায়িত্বশীল বিরোধী ভূমিকায় থাকার ঘোষণা জনস্বার্থের ইস্যুতে ছাড় দেবে না জামায়াত

অনলাইন ডেস্ক

১০ মার্চ ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে নতুন এক প্রত্যাশার আবহ তৈরি হয়েছে এরই মধ্যে। দীর্ঘকাল পর সংসদীয় রাজনীতি নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ইতোমধ্যে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। অতীতের ‘গৃহপালিত’ বিরোধীদলের মতো হবে না তাদের ভূমিকা। দলের নেতারা বলছেন, সংসদে তারা জনগণের অধিকারের বিষয়গুলো জোরালোভাবে উত্থাপন করবেন এবং জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করতে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখবেন।

দলটির একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কূটনৈতিক মহলের সঙ্গেও জামায়াত নেতাদের বৈঠকে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি ও বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব বৈঠকে দলটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, জাতীয় সংসদে গেলে তারা জনস্বার্থের প্রশ্নে সক্রিয় ও প্রাণবন্ত ভূমিকা পালন করতে চান। বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করবেন না। প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন।

বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও অর্থবহ করে তোলা এখন সময়ের দাবি। মানুষ অতীতের সংসদ দেখেছে, এবার তারা সংসদকে তার প্রকৃত চিত্র ফেরে পেতে দেখবে। যেখানে গণতান্ত্রিক চর্চা হবে। কারও বন্দনা গেয়ে সময় নষ্ট করা হবে না। তার ভাষায়, সরকার যদি জনগণের কল্যাণে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে, তবে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত সেই উদ্যোগকে সমর্থন করবে। তবে জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত এলে সংসদে জোরালোভাবে প্রতিবাদ জানানো হবে এবং প্রয়োজনে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথেও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। তিনি আরও বলেন, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদ শুধু আইন প্রণয়নের জায়গা নয়; এটি সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সংসদে সরকার ও বিরোধী দলÑ এই দুই শক্তির ভারসাম্যই গণতন্ত্রকে কার্যকর করে তোলে। তাই বিরোধী দল হিসেবে জনগণের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই হবে আমাদের প্রধান দায়িত্ব।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক আব্দুল হালিম আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের সংসদ সদস্যরা অতীতের অযৌক্তিক বা প্রতীকী বিরোধিতার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে যুক্তিনির্ভর ও ইস্যুভিত্তিক বিরোধী রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে সবটুকু করবে। সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগে সহযোগিতা এবং জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদÑ এই দুই নীতির সমন্বয় ঘটিয়েই সংসদে ভূমিকা রাখবে আমাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সারোয়ার জাহান আমাদের সময়কে বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই কার্যকর বিরোধী দলের অভাব নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। কখনও বিরোধী দল সংসদ বর্জন করেছে, আবার কখনও সংসদের ভেতরে কার্যকর বিতর্কের পরিবেশ তৈরি হয়নি। ফলে জাতীয় সংসদ অনেক সময়ই জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পূর্ণাঙ্গ ভূমিকা রাখতে পারেনি। সেই প্রেক্ষাপটে এবারের ত্রয়োদশ সংসদে বিরোধী শক্তি হিসেবে জামায়াতের উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে। দেখা যাক, তারা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল জায়গা সংসদকে সত্যিই কার্যকর করে, নাকি কথার কথা। সময়ই বলে দেবে সব।

ত্রয়োদশ সংসদে জামায়াতের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের বড় অংশই প্রথমবারের মতো সংসদে প্রবেশ করছেন। এ কারণে সংসদীয় কার্যক্রম সম্পর্কে তাদের প্রস্তুত করতে দলটি আগেভাগেই বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। শপথ গ্রহণের পরে দলীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে একাধিক বৈঠক ও প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে দলটি। এই কর্মশালায় বিল প্রণয়ন প্রক্রিয়া, বাজেট আলোচনা, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাজ, প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণের কৌশল এবং সংসদীয় বিধি-বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়। দলীয় সূত্র জানায়, সংসদকে কার্যকর বিতর্কের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে পারার মতো সক্ষমতা গড়ে তুলতেই এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে।

আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। অধিবেশনের শুরু থেকেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় সামনে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী দল। এর মধ্যে রয়েছেÑ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ, জননিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোট-সংক্রান্ত বিতর্ক।

দলটির নতুন সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান বলেন, জনগণের জীবনযাত্রা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে সংসদে সরকারের কাছে জবাবদিহি চাওয়া হবে এবং সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হবে। সরকারকে ছাড় দিতে নারাজ বলে জানান জামায়তের এই সদস্য।

অবশ্য বিরোধী দল সংসদে নানা বিষয় যেমন উত্থাপন করবে, তেমনি সরকারি দলও এ বিষয়ে প্রস্তুত বলে জানা গেছে। বিরোধী দলের ‘চাপ’ মোকাবিলায় সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা তথ্যের ভিত্তিতে বিরোধীদের অভিযোগ খণ্ডন করেন। সংসদ নেতা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা সংসদীয় রীতি মেনেই সব প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত বলে জানানো হয়েছে। এ জন্য বিএনপি গত শুক্র ও শনিবার তাদের সংসদ সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৯৭ আসনের ফল গেজেট আকারে ঘোষণা করা হয়েছে। বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ৬৮টি। বাকি আসনগুলোতে বিভিন্ন জোট, দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। এবারের নির্বাচনে বিজয়ীদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন কখনও সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হননি। তার মধ্যে বিরোধী দল জামায়াতের ৮০ ভাগ সংসদ সদস্য একেবারেই নতুন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, নতুন সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নীতিগত বিতর্ক ও ইস্যুভিত্তিক আলোচনা বাড়লে তা সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শক্তিশালী সরকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি দায়িত্বশীল ও সক্রিয় বিরোধী দলও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একে অপরকে বাদ দিয়ে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়