অনলাইন ডেক্স :
শিশুর রক্তাল্পতা (Anemia in Children) একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা কমবয়সী শিশুর বৃদ্ধি, বুদ্ধিবিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রভাবিত করে। রক্তাল্পতা বলতে রক্তে হিমোগ্লোবিন বা লোহিত রক্তকণিকার ঘাটতিকে বোঝায়। এর ফলে শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। শৈশবে কোষ বিভাজন, মস্তিষ্কের বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হয়। তাই এ সময় রক্তাল্পতা দেখা দিলে তার প্রভাব আরও গভীর হয়। বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর রক্তাল্পতার বড় কারণ- আয়রনের ঘাটতি। খাদ্যতালিকায় আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের অভাব, রক্তক্ষরণ বা শোষণজনিত সমস্যাও এর কারণ। এছাড়া থ্যালাসেমিয়া বা সিকেল সেল রোগের মতো জন্মগত হেমাটোলজিক সমস্যা অনেক শিশুর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রক্তাল্পতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জীবাণুজাত সংক্রমণ, যেমন- ম্যালেরিয়া, দীর্ঘস্থায়ী ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ বা প্রদাহজনিত রোগ রক্তকণিকা ধ্বংস বা উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে। ভিটামিন বি১২ এবং ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতিও রক্ত তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। অনেক ক্ষেত্রে অন্ত্রের ভেতরের লুকায়িত রক্তপাত বা জঠরান্ত্রিক সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে রক্তাল্পতার দিকে নিয়ে যায়, যা প্রথমদিকে শনাক্ত করা কঠিন।
রক্তাল্পতার লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। প্রাথমিক অবস্থায় তা সাধারণ অসুস্থতা মনে হতে পারে। শিশু প্রায়ই অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে, স্বাভাবিক কাজকর্মে আগ্রহ কমে যায়, ত্বক বা ঠোঁট ফ্যাকাশে দেখা যায়। হিমোগ্লোবিন খুব কমে গেলে বুক ধড়ফড় করা, শ্বাসকষ্ট, খাওয়া-দাওয়া কমে যাওয়া এবং মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না হলে শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, পড়াশোনার দক্ষতা কমে যেতে পারে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে ঘনঘন সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। রক্তাল্পতা নির্ণয়ে চিকিৎসক সাধারণত সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা (CBC) করে থাকেন, যেখানে হিমোগ্লোবিন, লোহিত রক্তকণিকা ও তাদের আকার-আকৃতি (MCV, MCH) মূল্যায়ন করা হয়। রেটিকুলোসাইট কাউন্ট দেখে বোঝা যায়, শরীর নতুন রক্তকণিকা তৈরি করছে কিনা। আয়রনের ঘাটতি নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আয়রন প্রোফাইল। এখানে সেরাম আয়রন, ফেরিটিন, TIBC এবং শতাংশ স্যাচুরেশন মূল্যায়ন করা হয়। ফেরিটিন কম থাকলে সাধারণত আয়রন ঘাটতির রক্তাল্পতা ধরা পরে। জন্মগত রোগের সন্দেহ থাকলে হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফোরোসিস এবং জিনগত পরীক্ষা করা হয়, যা থ্যালাসেমিয়া বা সিকেল সেল রোগ নির্ণয়ের মানসম্মত উপায়।
চিকিৎসা নির্ভর করে রক্তাল্পতার কারণের ওপর। আয়রন ঘাটতি থাকলে লাল মাংস, ডাল, পালংশাক, কলিজা, ডিম ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে, শৈশব থেকেই সুষম খাবার প্রদান, পর্যায়ক্রমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আয়রন সাপ্লিমেন্টেশনের প্রয়োজন হলে তা গ্রহণ এবং অন্ত্র বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, শিশুর রক্তাল্পতা একটি প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা, তবে এটি দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। অভিভাবকের উচিত শিশুর আচরণ, শক্তি, খাওয়া-দাওয়া এবং শারীরিক পরিবর্তনগুলোর ওপর নজর রাখা এবং সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। তথ্যভিত্তিক সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং সময়মতো চিকিৎসাই পারে শিশুকে সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশের পথে এগিয়ে রাখতে।