তাইওয়ানে কোনো যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করতে গেলে মার্কিন সামরিক বাহিনী চীনের কাছে পরাজিত হতে পারেÑ এমনটাই ইঙ্গিত মিলল পেন্টাগনের এক অতি গোপনীয় মূল্যায়ন থেকে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
সম্প্রতি তাইওয়ানে চীনা আগ্রাসন পরিস্থিতি তৈরি করে মহড়া চালায় যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে দেখা গেছে, বেইজিং চাইলে মোতায়েনের আগেই মার্কিন ফাইটার স্কোয়াড্রন, বড় যুদ্ধজাহাজ; এমনকি উপগ্রহ নেটওয়ার্কগুলোকেও অচল করে দিতে পারে। অত্যন্ত শ্রেণিবদ্ধ এই নথির নাম হলো ‘ওভারম্যাচ ব্রিফ।’
পেন্টাগনের অফিস অব নেট অ্যাসেসমেন্টের তৈরি করা এই দলিলে দেখা যাচ্ছেÑ যুক্তরাষ্ট্র তার উন্নত এবং মহামূল্যবান অস্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ায় চীনের দ্রুত তৈরি করা কম দামি অস্ত্রের সামনে সে বড়ই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছে। ওই প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, সংঘাত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চীন আমেরিকান সম্পদগুলো অকেজো করে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এর কয়েক দিন আগেই চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাইওয়ান প্রশ্নটি ‘পরম বিচক্ষণতার সঙ্গে সামলাতে’ হুশিয়ারি দিয়েছেন। ২০২১ সালে যখন বাইডেন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা এই ‘ওভারম্যাচ ব্রিফ’ রিপোর্টের সারসংক্ষেপ পান, তখন তিনি ‘ফ্যাকাশে’ হয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে উপস্থিত এক মার্কিন কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, সেই কর্মকর্তা বুঝেছিলেন যে, ‘আমাদের যত কৌশল ছিল, চীনারা তার প্রতিটির জন্য একাধিক বিকল্প তৈরি করে রেখেছে।’
চীন তাইওয়ানকে অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে এবং জোর দিয়ে বলে যে, ২ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার এই দ্বীপটিকে শেষ পর্যন্ত মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হতেই হবেÑ প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করেও। অন্যদিকে তাইওয়ান নিজেদের একটি সার্বভৌম, স্বাধীন দেশ হিসেবে মনে করে। তাদের বক্তব্যÑ তাইওয়ানের অবস্থার যে কোনো পরিবর্তন গণতান্ত্রিক উপায়ে সেখানকার জনগণের দ্বারাই নির্ধারিত হওয়া চাই, চীনের দ্বারা চাপানো কোনোভাবেই নয়।
যদিও চীন তাইওয়ান আক্রমণ করার কোনো সময়সীমা দেয়নি, তবু পশ্চিমা শক্তিগুলোর মূল্যায়ন ও গোয়েন্দা তথ্য দাবি করে যে, চীন সম্ভবত ২০২৭ সালের কাছাকাছি সময়ে তাইওয়ান দখলের জন্য প্রচেষ্টা শুরু করতে পারে, যা শি জিনপিংয়ের সামরিক আধুনিকীকরণের লক্ষ্যের সঙ্গে মিলে যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০ বছরে চীন যে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ করেছে, তা দিয়ে তারা তাইওয়ানে পৌঁছানোর আগেই আমেরিকার অনেক উন্নত অস্ত্র, যেমনÑ বিমানবাহী রণতরীগুলো ধ্বংস করে দিতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি মহড়াগুলোতে দেখা গেছে, এমনকি মার্কিন নৌবাহিনীর সব থেকে নতুন রণতরীটিও প্রায়ই চীনা আক্রমণ সামলাতে সক্ষম হবে নাÑ এমনটাই জানাচ্ছে সেই মূল্যায়ন।
এতে উদাহরণ হিসেবে আমেরিকার সব থেকে নতুন ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড রণতরীটির উল্লেখ করা হয়েছে, যা তৈরি করতে খরচ হয়েছে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার এবং যা ২০২২ সালে মোতায়েন করা হয়েছে। নতুন প্রযুক্তি, যার মধ্যে আরও উন্নত পারমাণবিক চুল্লিও রয়েছেÑ তা থাকা সত্ত্বেও এই রণতরীটি চীনা হামলা থেকে রক্ষা পেতে পারবে না।
প্রতিবেদন অনুসারে, ভেনেজুয়েলার মতো দুর্বল শক্তির বিরুদ্ধে কার্যকরী হলেও ফোর্ড রণতরীটি ‘আক্রমণের নতুন রূপে মারাত্মকভাবে অরক্ষিত।’ এ ছাড়া, এই প্রতিবেদনে বাস্তব-জগতের উদাহরণও টানা হয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ পশ্চিমা অস্ত্রশস্ত্রের পরীক্ষা নিচ্ছে এবং আমেরিকার প্রতিপক্ষরা তাদের দুর্বলতা ও শক্তি উভয় সম্পর্কেই জানতে পারছে।