বর্তমান সময়ে নগরবাসীর কাছে ভূমিকম্প যেন এক আতঙ্কের নাম। ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে অন্তত তিনবার কেঁপে ওঠে ঢাকা। স্বল্প মাত্রার ভূমিকম্পে তেমন কোনো ক্ষতি না হলেও শক্তিশালী ভূমিকম্পে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে থাকে। কম্পনের মাত্রা ৩-এর নিচে হলে সাধারণত টের পাওয়া যায় না। মাত্রা
৩-এর বেশি হলে কম্পন অনুভব করা যায়। আর ভূ-কম্পনের মাত্রা ৭ থেকে শুরু করে ওপরে হলে একটা গোটা শহর বা এলাকা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আমাদের আজকের আয়োজন বিশ্বের ভয়াবহ কিছু ভূমিকম্প নিয়ে। ইন্টারনেট থেকে তথ্য নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন আজহারুল ইসলাম অভি
চীনের শানশি ভূমিকম্প (১৫৫৬)
১৫৫৬ সালের ২৩ জানুয়ারি চীনের শানশি প্রদেশ এবং এর আশপাশের অঞ্চলে আনুমানিক ৮ মাত্রার এক ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা ইতিহাসে শানশি মহাভূমিকম্প বা জিয়াজিং মহাভূমিকম্প নামে পরিচিত। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মানব ইতিহাসে নথিভুক্ত সবচেয়ে মারাত্মক ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর কেন্দ্রস্থল ছিল শানশি প্রদেশের ওয়েই নদী উপত্যকায়। শক্তিশালী কম্পনের ফলে ৯৭টিরও বেশি কাউন্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং প্রায় ৮৪০ কিলোমিটার (৫২০ মাইল) বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে ধ্বংসলীলা চলে। ভূমিকম্পের প্রত্যক্ষ প্রভাবে ভূমিধস হয়, নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয় এবং ভূমি সমতল ফেটে গিয়ে ২০ মিটার গভীর ফাটলের সৃষ্টি হয়। এই অঞ্চলের বহু মানুষ মাটির নরম লোয়েস (খড়বংং) গুহায় নির্মিত বাড়িতে বাস করত, যা কম্পনের ফলে ধসে পড়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়। ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পে আনুমানিক ৮ লাখ ৩০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই বিশালসংখ্যক মৃত্যুর মধ্যে সরাসরি কম্পনের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে মহামারী, দুর্ভিক্ষ এবং অনাহারজনিত কারণেও বহু মানুষ মারা যায়। এই চরম বিপর্যয় শানসি প্রদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশকে নিশ্চিহ্ন করে দেয় এবং মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
১৭৫৫ সালের গ্রেট লিসবন ভূমিকম্প
পর্তুগালের রাজধানী লিসবন-এ ১৭৫৫ সালের ১ নভেম্বর এক ভয়ংকর প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে, যা ইতিহাসে গ্রেট লিসবন ভূমিকম্প নামে পরিচিত। সেই দিনটি ছিল ক্যাথলিকদের পবিত্র ‘অল সেইন্টস ডে’ (অষষ ঝধরহঃং উধু), যখন লিসবনের অসংখ্য বাসিন্দা উপাসনার জন্য গির্জায় সমবেত হয়েছিলেন। স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে প্রথম কম্পন অনুভূত হয়। আধুনিক সিসমোলজিস্টদের অনুমান অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.৭ থেকে ৯-এর মধ্যে, যা এটিকে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটিতে পরিণত করে। ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ছিল পর্তুগালের উপকূল থেকে প্রায় ২০০ কিমি (১২০ মাইল) দক্ষিণ-পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে। মূল ভূমিকম্পের কম্পন তিন থেকে ছয় মিনিট স্থায়ী হয়েছিল, যার ফলে শহরের প্রায় ৮৫ শতাংশ দালানকোঠা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বিশেষ করে মাটির কম্পন সহ্য করতে না পেরে অসংখ্য গির্জা ধসে পড়ায় সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার উপাসক চাপা পড়ে মারা যান। ভূমিকম্পের পরপরই দ্বিতীয় মারাত্মক আঘাত হানে- একটি বিশাল সুনামি (ঞংঁহধসর)। মহাসাগরের গভীরে প্লেটের স্থানচ্যুতির ফলে সৃষ্ট প্রায় ৫ থেকে ১৫ মিটার (১৬ থেকে ৪৯ ফুট) উচ্চতার ঢেউ তাগুস (ঞধমঁং) নদীর মোহনা দিয়ে লিসবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং উপকূলীয় অঞ্চল প্লাবিত করে দেয়। যারা ভূমিকম্প থেকে বাঁচতে খোলা জায়গায় বা ডকের দিকে ছুটে গিয়েছিলেন, তারা এই সুনামির শিকার হন। একই সঙ্গে, অসংখ্য উল্টে যাওয়া মোমবাতি ও রান্নার চুলা থেকে শহরে ভয়াবহ আগুন লেগে যায়। ভূমিকম্প, সুনামি ও অগ্নিসংযোগ মিলিয়ে লিসবনে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। আধুনিক ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মৃতের সংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য অনুমান অনুযায়ী, লিসবন শহরে ১০,০০০ থেকে ৪০,০০০ মানুষ মারা গিয়েছিল। তবে কিছু প্রতিবেদনে ৬০,০০০ পর্যন্তও উল্লেখ আছে। সেই সময়ে ইউরোপের চতুর্থ বৃহত্তম এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ এই শহরটির ধ্বংস ইতিহাসের পাতায় একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত। এই বিপর্যয় ইউরোপের বুদ্ধিজীবীমহলে ধর্ম, প্রকৃতি ও মানবতা নিয়ে গভীর দার্শনিক বিতর্কের জন্ম দেয় এবং এটিকে অনেক ঐতিহাসিক প্রথম আধুনিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই ঘটনার পরই পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী মার্কুইস অব পোম্বাল (গধৎয়ঁরং ড়ভ চড়সনধষ)-এর নেতৃত্বে লিসবন শহরকে আধুনিক পরিকল্পনা অনুযায়ী চওড়া রাস্তা ও ভূমিকম্প-সহনশীল কাঠামোর সাহায্যে পুনর্নির্মাণ করা হয়।
দ্য গ্রেট চিলিয়ান ভূমিকম্প (১৯৬০)
লাতিন আমেরিকার পশ্চিম উপকূলবর্তী দেশ চিলি একটি অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। এই দেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে ১৯৬০ সালের ২২ মে বিকেলে এক মহাবিপর্যয় ঘটে, যা ইতিহাসে দ্য গ্রেট চিলিয়ান ভূমিকম্প নামে পরিচিত। এটি ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেট ও দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের মধ্যেকার টেকটোনিক সংঘর্ষের ফল। আধুনিক ভূকম্পবিজ্ঞান অনুসারে, এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৯.৫, যা এটিকে পৃথিবীর ইতিহাসে বৈজ্ঞানিকভাবে রেকর্ডকৃত সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে নিশ্চিত করেছে। এই ভয়াবহ কম্পন প্রায় ১০ মিনিট ধরে স্থায়ী ছিল, যা চিলির দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করে। ভূমিকম্পের মূল আঘাতের ১৫ মিনিট পরেই চিলির উপকূলজুড়ে বিশাল আকারের সুনামি আছড়ে পড়ে। সমুদ্রের ঢেউ কোথাও কোথাও ২৫ মিটার (৮২ ফুট) পর্যন্ত উঁচু হয়েছিল, যা উপকূলীয় শহর, বন্দর ও গ্রামগুলোকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। শুধু চিলিই নয়, এই সুনামির ঢেউ প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে সুদূর হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ, জাপান এবং ফিলিপাইনেও আঘাত হেনেছিল, যেখানেও ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। এই ভূমিকম্প ও সুনামির সম্মিলিত প্রভাবে চিলিতে আনুমানিক ১,৬৫৫ থেকে ৬,০০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে চিলির বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ভালদিভিয়া, পুয়ের্তো মন্ট এবং কনসেপসিওন-এর মতো শহরগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই বিপর্যয় দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামোতে বিশাল প্রভাব ফেলে। ভূমিকম্প ও সুনামির কারণে চিলিতে প্রায় ২০ লাখের বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে গৃহহীন বা বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে চিলির সরকার দ্রুত পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে। এই দুর্যোগ কেবল চিলির জন্য নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি কার্যকর সুনামি সতর্কতা ব্যবস্থা (ঞংঁহধসর ডধৎহরহম ঝুংঃবস) গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছিল।
আলাস্কা ভূমিকম্প ১৯৬৪
যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য আলাস্কার প্রিন্স উইলিয়াম সাউন্ডে ১৯৬৪ সালে ৯.২ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এর ফলে আলাস্কায় ভয়ংকর ভূমিধস ও সুনামিরও সৃষ্টি হয়েছিল। এতে ১২৮ জনের নিহত হয়। এ ছাড়া ৩১ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়।
উত্তর সুমাত্রা দ্বীপে ভূমিকম্প (২০০৪)
২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার উত্তর সুমাত্রার পশ্চিম উপকূলে এক বিশাল আকারের ভূমিকম্প আঘাত হানে। এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৯.১ থেকে ৯.৩-এর মধ্যে। এর কম্পন এত শক্তিশালী ছিল যে এটি পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ স্পন্দনকে কিছুটা পরিবর্তন করে দিয়েছিল। সমুদ্রের নিচে ইউরেশীয় প্লেট এবং ইন্দো-অস্ট্রেলীয় প্লেটের মধ্যকার সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট এই বিশাল কম্পনের জেরে মুহূর্তের মধ্যে ভারত মহাসাগরের তলদেশে উল্লম্ব স্থানচ্যুতি ঘটে এবং তা থেকেই জন্ম নেয় ইতিহাসের অন্যতম বিধ্বংসী এই সুনামি। এই ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট সুনামিটি ভারত মহাসাগরের উপকূলবর্তী ১৪টি দেশে অনুভূত হয়েছিল। সুনামিটি অবিশ্বাস্য গতিতে উপকূলের দিকে ধেয়ে এসেছিল। এই বিপর্যয়ে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল অত্যন্ত ব্যাপক; আনুমানিক ২ লাখ ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়। সরকারি হিসাব মতে হতাহতের সংখ্যা যদিও ১ লাখ ৭০ হাজার বলা হয়েছে, তবে তার বেশিসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর তথ্যটিও সঠিক। এই দুর্যোগে বহু মানুষের লাশ উদ্ধার করাও সম্ভব হয়নি। ইন্দোনেশিয়া, বিশেষ করে আচেহ প্রদেশ, ছিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। ঢেউয়ের উচ্চতা ইন্দোনেশিয়ার কিছু অংশে ৩০ মিটার (১০০ ফুট) পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ইন্দোনেশিয়া ছাড়াও শ্রীলংকা, ভারত, থাইল্যান্ড এবং এমনকি পূর্ব আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ার মতো বহু দূরবর্তী অঞ্চলেও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
এই বিধ্বংসী সুনামি শুধু প্রাণহানিই ঘটায়নি, এটি উপকূলীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের মৎস্যশিল্প এবং সমুদ্রতীরবর্তী কারখানাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সম্পূর্ণভাবে ভেসে যায়। এই ট্র্যাজেডির পর বিশ্বজুড়ে মানবতা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার এক বিশাল ঢেউ লক্ষ করা যায়, যার ফলস্বরূপ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে ব্যাপক ত্রাণ ও পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হয় এবং সমুদ্রের নিচে টেকটোনিক কার্যকলাপ নিরীক্ষণের জন্য উন্নত সুনামি সতর্কতা ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়।
জাপানে ভূমিকম্প (২০১১)
২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানের পূর্ব উপকূল তোহুকুতে এক ভয়াবহ ভুমিকম্প হয়। ভূমিকম্পটি ৯ মাত্রার ছিল। ভূমিকম্পের পর হয় ভয়ংকর সুনামি। এতে জাপানের ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় পারমাণবিক চুল্লি।
কামচাটকা ভূমিকম্প (১৯৫২)
১৯৫২ সালের ৪ নভেম্বর রাশিয়া ও হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। এর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্টি হয় সুনামি। এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল কামচাটকা উপদ্বীপ। তিন হাজার মাইলজুড়ে অনুভূত হয়েছিল এই ভূ-কম্পন। এতে নিহতের তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া চলতি বছরের জুলাই মাসে রাশিয়ার কামচাটকা উপদ্বীপে ৮.৮ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ২৫ মিনিটে কম্পন শুরু হয়। এর পরই সুনামি তৈরি হয়। রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশে সতর্কতা জারি হয় এবং মানুষকে নিরাপদ স্থানে যেতে বলা হয়।
আরিকা, পেরু ভূমিকম্প (১৮৬৮)
১৮৬৮ সালের ১৩ আগস্ট প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট ৯ মাত্রার ভূ-কম্পন হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত অনুভূত হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকার আরেকুইপা শহর। সেখানে অন্তত ২৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।
উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে ভূমিকম্প (সপ্তদশ শতাব্দী)
১৭০০ সালের ২৬ জানুয়ারি উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। তবে এর কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। উত্তর আমেরিকা মহাদেশের অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প মনে করা হয় এটিকে। এই ভূমিকম্পের পর সুনামি ভ্যাংকুভার দ্বীপের পাচেনা উপকূলের অধিবাসীদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
চিলির ভূমিকম্প (২০১০)
২০১০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এ দেশে ফের ভয়াবহ এক ভূমিকম্প হয়, রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৮.৮। এই ভূমিকম্পে প্রাণ হারায় ৫২১ জন। আহত হয় অন্তত ১২ হাজার। এ সময় ৮ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছে।
ইকুয়েডরের উপকূলে ভূমিকম্প (১৯০৬)
১৯০৬ সালের ১৩ জানুয়ারি ইকুয়েডর ও কলম্বিয়ার সমুদ্র উপকূলে ৮.৮ মাত্রার ভূমিকম্পের পর সৃষ্টি হওয়া সুনামিতে নিহত হয় ৫০০-এর বেশি মানুষ।
আসাম-তিব্বতে ভূমিকম্প (১৯৫০)
১৯৫০ সালের ১৫ আগস্ট বর্তমান ভারতের আসাম ও চীনের তিব্বতে ৮.৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এ ভূমিকম্পে আসাম-তিব্বতের ৭০টি গ্রাম ধবংস হয়ে যায়। নিহত হয় হাজার হাজার মানুষ। ভূমিকম্পের পরে দেখা দেয় ভয়াবহ বন্যা।
তুরস্ক-সিরিয়া ভূমিকম্প (২০২৩)
পৃথিবীর সর্বশেষ ভয়াবহ ভূমিকম্প হয় ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। এটি তুরস্ক-সিরিয়ায় অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.৮, উৎপত্তি তুরস্কের গাজিয়ান্তেপ অঞ্চলে। এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
বাংলাদেশের যত ভূমিকম্প
চলতি বছরের ভূমিকম্প : ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুভূত ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের আসাম রাজ্যের মরিগাঁও। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫.৩। এরছাড়া চলতি বছরের ৫ মার্চ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকা। ঢাকা থেকে উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ৪৪৯ কিলোমিটার। উৎপত্তিস্থলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫.৬। গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫.৯ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের আসাম রাজ্যে। এরপর ২১ সেপ্টেম্বর ৪ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকা থেকে ১৮৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। দুপুর সাড়ে ১২টার পর অনুভূত হওয়া এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেটের ছাতকে।
২০২৩-এর যত ভূমিকম্প : ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাত ৮টা ৪৯ মিনিটে রাজধানীসহ দেশের অধিকাংশ এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, এর মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫.৫, যা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প। একই বছরের ১৬ জুন রাজধানীসহ সারাদেশে ৪.৫ মাত্রার মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেটের গোলাপগঞ্জ। ২০২৩ সালের মে মাসের ৫ তারিখে আরেকটি ভূমিকম্প হয় ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের হিসাব অনুযায়ী, ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪.৩। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছে বিক্রমপুরের দোহার থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। এটিরও গভীরতা ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার। ২০২৩ সালের ২ ডিসেম্বর সকালে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অফিস জানায়, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫.৬। সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে এই ভূমিকম্পটি ঘটে।
২০১৫ সালের ভূমিকম্প : নেপালে ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যাতে প্রায় ৯ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। এই ভূমিকম্প এতটাই প্রবল ছিল যে, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ভুটান, চীনসহ আশপাশের প্রায় সব দেশেই এর কম্পন অনুভূত হয়।
২০১৬ সালের ভূমিকম্প : ২০১৬ সালের ৪ জানুয়ারি ৬.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে বাংলাদেশ। ওই সময় আতঙ্কে প্রাণ হারায় ছয়জন।
১৯৯৯ সালের ভূমিকম্প : বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের শেষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্পটি হয় মহেশখালী দ্বীপে। ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে এই দ্বীপকেন্দ্রিক ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পে দ্বীপের অনেক বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৯৯৭ সালের ভূমিকম্প : ১৯৯৭ সালের ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ভূমিকম্পের কারণে চট্টগ্রামে নির্মাণাধীন বহুতল ভবন ধসে পড়ে। সেদিন চট্টগ্রামে ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে শহরের বিভিন্ন স্থাপনায় ফাটল দেখা দেয়।
১৯৫০ সালের ভূমিকম্প : ১৯৫০ সালে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ৮.৫ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। এতে ভারতে চার হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারায় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কম্পন অনুভূত হয় বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের কিছু অংশে, তবে এসব এলাকায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
১৯১৮ সালের ভূমিকম্প : ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প নামে পরিচিত। এই কম্পন মিয়ানমার ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও অনুভূত হয়। শ্রীমঙ্গলে ওই ভূমিকম্পে অনেক দালানকোঠা ধ্বংস হয়ে যায়।
১৮৯৭ সালের ভূমিকম্প : ১৮৯৭ সালের ১২ জুন শিলং প্ল্যাটোতে ৮.২ মাত্রার একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক নামে পরিচিত। এর ঝাঁকুনি দিল্লি থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত অনুভূত হয়। মেঘালয়, সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকা অঞ্চলে এই ভূমিকম্পে ১৬০০-র বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এই ভূমিকম্পের পর ইংরেজরা আতঙ্কে তাঁবু টাঙিয়ে থাকতে শুরু করে এবং অনেকে কয়েক মাস নৌকায় বসবাস করেছিল।
১৮৮৯ সালের ভূমিকম্প : ১৮৮৯ সালের ১০ জানুয়ারি মেঘালয়ে ৭.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর কেন্দ্রস্থল ছিল ভারতের মেঘালয়ের জৈন্তা পাহাড়। এই ভূমিকম্প সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য খুব কম পাওয়া যায়, তবে সিলেট শহরসহ আশপাশের এলাকায় এর কম্পন স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছিল।
১৮৮৫ সালের ভূমিকম্প : ১৮৮৫ সালে মধুপুর ফল্টে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়, যা বেঙ্গল ভূমিকম্প নামে পরিচিত। এর উৎপত্তিস্থল ছিল মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া। ধারণা করা হয়, এর মাত্রা ছিল ৬.৫ থেকে ৭। এটি এতটাই প্রবল ছিল যে, ভারতের সিকিম, বিহার, মণিপুর এবং মিয়ানমার পর্যন্ত এর কম্পন অনুভূত হয়।