প্রকাশিত : ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৫৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মুক্ত বিনিয়োগ নীতি ঘোষণার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় আইনজীবী সমিতি

আয়কর বার্তা রিপোর্ট:
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয় আইনজীবী সমিতি ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করে। সভায় সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি বিস্তারিত লিখিত বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়, যেখানে দেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।
৩০ এপ্রিল বৃহসপতিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, এফসিএমএ। সভায় প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ জাতীয় আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহ মো. খসরুজ্জামান।


অর্থনীতির বর্তমান চিত্র: সংকট ও চ্যালেঞ্জ
প্রস্তাবনায় দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, মুদ্রাবাজারে তীব্র অর্থসংকট বিরাজ করছে, যার ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। বাজেটে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ১১৩.৫১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর ঋণের কিস্তি ছাড় পেতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি একটি প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও কৌশল প্রশংসার দাবি রাখে বলেও উল্লেখ করা হয়।


অর্থ পাচার ও বিনিয়োগ সংকট
লিখিত প্রস্তাবে দেশের অর্থনীতির দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে অর্থ পাচারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, প্রচলিত করব্যবস্থা ও আইনগত পরিবেশের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিত্তশালীরা দেশে অর্থ বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হয়ে বিদেশে অর্থ স্থানান্তর করছেন। তবে বিদেশে অর্থ রাখা পুরোপুরি নিরাপদ নয়—এমন পর্যবেক্ষণও তুলে ধরা হয়। এ পরিস্থিতিতে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও আকর্ষণীয় নীতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়।


“মুক্ত বিনিয়োগ নীতি” ঘোষণার আহ্বান
প্রাক-বাজেট আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্ব পায় “মুক্ত বিনিয়োগ নীতি” ঘোষণার প্রস্তাব। এতে বলা হয়, দেশে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি।
প্রস্তাবনায় বলা হয়, নতুন বিনিয়োগকৃত অর্থের ওপর কর অব্যাহতি দেওয়া, বিনা প্রশ্নে নির্দিষ্ট হারে কর গ্রহণ করে অর্থ বৈধ করার সুযোগ রাখা, সকল খাতে উন্মুক্ত বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা— এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দেশের মুদ্রাবাজারে তারল্য সংকট দ্রুত কমে আসবে।
সংগঠনটির মতে, নগদ অর্থের ওপর ৫ থেকে ৭ শতাংশ হারে কর গ্রহণ করে বিনা প্রশ্নে অর্থ গ্রহণের সুযোগ দিলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে ফিরে আসতে পারে। তবে করের হার এক অঙ্কের মধ্যে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়, অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।


এসআরও জারির সুপারিশ
প্রস্তাবে জরুরি ভিত্তিতে স্ট্যাটিউটরি রেগুলেটরি অর্ডার (এসআরও) জারির মাধ্যমে বিত্তশালী ও করদাতাদের নতুন বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই মুদ্রাবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে।
এর ফলে—ব্যবসা-বাণিজ্য সচল হবে, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, ডলার সংকট কমবে, এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসবে। 


করব্যবস্থার সংস্কার ও বিকেন্দ্রীকরণ
রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য কর আহরণ ব্যবস্থাকে শহরকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে গ্রামভিত্তিক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, বর্তমানে গ্রামাঞ্চলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সম্পদশালী ব্যক্তি রয়েছেন, ফলে প্রতি উপজেলায় কর কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সম্ভব।


ভ্যাট ও অন্যান্য প্রস্তাব
সভায় ব্যবসায়ীদের স্বার্থে বাড়িভাড়ার ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট ভাড়াটিয়ার পরিবর্তে বাড়িওয়ালার কাছ থেকে আদায়ের সুপারিশ করা হয়। এতে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ কমবে বলে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া আইনজীবীদের মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ১৫ শতাংশ ভ্যাট কর্তনের বিষয়টি ভ্যাট আইনের পরিপন্থি বলে দাবি করা হয় এবং তা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়।


আইনজীবীদের কল্যাণ তহবিল
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বেনিভোলেন্ট ফান্ডে আদালতের মাধ্যমে জমাকৃত কোর্ট ফি’র একটি অংশ প্রদানের দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। এ বিষয়ে প্রস্তাব ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হয় এবং আগামী বাজেটে তা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ কামনা করা হয়।
সভায় বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চারের মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব হবে বলে তারা মনে করেন।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়