প্রকাশিত : ২৫ মার্চ, ২০২৬, ১২:১৪ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পুণ্যস্নান সফল হোক, চাঁদাবাজি নিপাত যাক: মাধবপাশার দুর্গাসাগর


মামুনুর রশিদ:

২৬ মার্চ ২০২৬, বৃহস্পতিবার অশোকাষ্টমী। চৈত্র মাসের এই তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় অন্নপূর্ণা পূজা। এদিন পাপমোচনের আশায় পুণ্যস্নানের প্রথা শত বছরের ঐতিহ্য বহন করে আসছে। অশোকাষ্টমীর এই পুণ্যতিথিকে কেন্দ্র করে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাসাগর দীঘিতে প্রতি বছরের মতো এবারও পুণ্যার্থীদের ঢল নামে। বৃহস্পতিবার ভোররাত থেকে শুরু হওয়া হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পুণ্যস্নান সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলবে (তিথি অনুযায়ী সময়ের কিছু তারতম্য হতে পারে)।
প্রতিবছর চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলা—পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুর থেকে অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী দুর্গাসাগর দীঘিতে সমবেত হন। ভক্তদের বিশ্বাস, অশোকাষ্টমীর পুণ্যতিথিতে এই দীঘিতে স্নান করলে পাপমোচন হয় এবং মোক্ষ লাভ সম্ভব।প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অশোকাষ্টমী উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দুর্গাসাগরে প্রবেশে কোনো টিকিটের প্রয়োজন হবে না। এ সময়ে সকল পুণ্যার্থীরা বিনা টিকিটে প্রবেশ করে পুণ্যস্নান সম্পন্ন করতে পারবেন।
পুণ্যস্নান উপলক্ষে দুর্গাসাগর দীঘির পাশেই মাধবপাশা চন্দ্রদ্বীপ স্কুল ও কলেজ মাঠে বসে জমজমাট মেলা। মেলায় হস্ত ও কুটিরশিল্পসহ নানা ভোগ্যপণ্যের শতাধিক দোকান বসে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রাভাব ফেলে। 
তবে মেলা ও পুণ্যস্নানকে ঘিরে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। সূত্র জানায়, মেলা ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক দিলীপ কুমার রায়ের(দিলিপ রাজা)নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হলেও অতীতে কিছু অসাধু চক্র এ কমিটিকে ব্যবহার করে দোকানদারদের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করে। মাঠ সংস্কার, স্বেচ্ছাসেবক ব্যয়, প্রশাসনিক খরচসহ বিভিন্ন অজুহাতে আদায়কৃত অর্থের একটি বড় অংশ আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে বলেও জানা গেছে। সূত্রটি আরও জানিয়েছে, ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো এ মেলায় কখনও প্রভাব বিস্তার করেনি। তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগও পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। আয়োজকদের দাবি, ধর্মীয় সম্প্রীতির নিদর্শন হিসেবে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে এ পবিত্র স্নান অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, কিছু রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে মেলার ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকেন এবং ব্যক্তিস্বার্থে এ আয়োজনকে ব্যবহার করেন।
সূত্র আরও জানায়, মেলা থেকে সংগৃহীত চাঁদার অর্থ দিয়ে বিপুল সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যয় নির্বাহ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০–৫০ জন শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবক, প্রায় ১০০ জন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য—ডিবি পুলিশ, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র‍্যাব,  থানা পুলিশ, পুলিশ কমিশনারের ফোর্স, ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের কর্মীরা অন্তর্ভুক্ত। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ জনের একদিনের খাবার, যাতায়াত ও বিভিন্ন খাতে নগদ অর্থ প্রদান করা হয় বলে জানা গেছে। এ তালিকায় কিছু সাংবাদিকের নামও রয়েছে বলে সুত্রটি নিশ্চিত করেছে।
স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা জানান, দুর্গাসাগর দীঘি থেকে প্রতিবছর জেলা প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় হয়। সে বিবেচনায় পুণ্যস্নান ও মেলার সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের নেওয়া উচিত। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।
এদিকে পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে পর্যাপ্ত ভ্রাম্যমাণ টয়লেট ও পোশাক পরিবর্তনের নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও এখনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি জেলা প্রশাসক। এছাড়া, কিছু উঠতি বয়সী যুবকের বিরুদ্ধে মোবাইল ফোন ও ক্যামেরার মাধ্যমে নারীদের পোশাক পরিবর্তনের দৃশ্য গোপনে ধারণ করার অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে ধারণকৃত এসব দৃশ্য ব্যবহার করে তারা নারীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করছে বলে জানা গেছে।
ইসলামী আন্দোলন, মাধবপাশা ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুফতি মাহমুদুল হাসান বলেন, মেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব খরচ জেলা প্রশাসনকে বহন করতে হবে। কারণ, দুর্গাসাগর দীঘি থেকে জেলা প্রশাসন প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করে। মেলা উপলক্ষে যারা দোকান বসাবেন, তাদের নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণকে কষ্ট দিয়ে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বরদাশত করা হবে না।
স্থানীয়রা আশা করছেন, প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে চাঁদাবাজি বন্ধ করবে এবং পুণ্যার্থীদের জন্য নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করবে। পবিত্র এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে কোনো অনিয়ম নয়—সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে পুণ্যস্নান সফল হোক, এটাই সবার প্রত্যাশা।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়