অনলাইন ডেক্স :
বিএনপির ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতি এখন উত্তেজনাপূর্ণ। ‘খালেদার ঘর’ নামে পরিচিত এই জেলা থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় লক্ষ্মীপুরকে বরাবরই বিএনপির দুর্গ হিসেবে দেখা হয়। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত টানা কয়েকটি নির্বাচনে জেলার চারটি আসনেই বিএনপির প্রার্থীদের বিজয় সেই অবস্থান আরও পোক্ত করেছিল। তবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সেই দুর্গ আগলে রাখতে এবার ঘাম ঝরাচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা।
চারটি আসনের মধ্যে দুটি আসনে এখনও বিএনপি প্রার্থী চূড়ান্ত না করায় নির্বাচনী মাঠে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। একদিকে ধানের শীষ প্রতীক সামনে রেখে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী এলাকায় গণসংযোগ চালাচ্ছেন, অন্যদিকে শরিক দলকে আসন ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষও স্পষ্ট। এই অনিশ্চয়তার সুযোগে চার আসনেই সংগঠিত ও আক্রমণাত্মক প্রচারে নেমেছে জামায়াত, যারা নিজেদের শক্ত উপস্থিতি জানান দিতে ঘরে ঘরে ভোট চাইছে। পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলনসহ অন্য দলও নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সমন্বয়, জোট রাজনীতির হিসাব-নিকাশ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর তৎপরতায় লক্ষ্মীপুরের নির্বাচন এবার শুধু আসন রক্ষার লড়াই নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ শক্তিবিন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসন
বিএনপি এখনও এ আসনে প্রার্থী দেয়নি। তবে সম্প্রতি শাহাদাত হোসেন সেলিম তার দল বিএলডিপি বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। দল থেকে ধানের শীষের কোনো প্রার্থী দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন মনোনয়নপ্রত্যাশী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হারুনুর রশিদ। দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী কয়েকজন নেতা তাদের ত্যাগের কথা তুলে ধরে ধানের শীষে ভোট চেয়ে প্রচারে ব্যস্ত রয়েছেন। এ আসন থেকে ধানের শীষের প্রার্থিতা পেতে সাবেক স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত জিয়াউল হক জিয়ার ছেলে মাশফিকুল হক জয়, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি ইয়াছিন আলী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী স্মার্ট টেকনোলজিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম কেন্দ্রে তদবির করে চলেছেন।
এদিকে এ আসন থেকে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম নির্বাচন করবেন বলে বিভিন্ন সভায় বক্তব্য দিয়ে আসছেন তার ভাই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলম। নির্বাচনের লক্ষ্যেই তিনি সরকার থেকে পদত্যাগ করেছেন। তবে কোন দল থেকে তিনি নির্বাচন করবেন তা জানা যায়নি। তার বাবা আজিজুর রহমান বাচ্চু উপজেলার ইছাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। অন্যদিকে এ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী
রামগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমির নাজমুল হাসান পাটোয়ারী ও ইসলামী আন্দোলন জেলা কমিটির সহ-সভাপতি জাকির হোসেন পাটওয়ারীও প্রচারে ব্যস্ত রয়েছেন। ইসলামিক জোটের প্রার্থিতা পাওয়ার জন্য দুজনই সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন।
এ আসনে জাতীয় পার্টির জেলা সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ, এবি পার্টির নেতা আনোয়ার হোসেন ও গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক শাহ মোহাম্মদ সাগর নির্বাচন করবেন। এখানে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৭৬০ জন ভোটার রয়েছেন।
লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদর একাংশ) আসন : বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ঘর হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৬ সালের ৭ম ও ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি এ আসন থেকে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। যদিও পরবর্তী সময়ে দুবারই তিনি এ আসন থেকে পদত্যাগ করায় সেখানে উপনির্বাচন হয়।
এ আসনে খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা সাবেক তিনবারের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। দিন-রাত নেতাকর্মীদের নিয়ে মানুষের দরজায় দরজায় গিয়ে ভোট চাচ্ছেন। আসনটিতে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী দলের জেলা কমিটির আমির এসইউএম রুহুল আমিন ভূঁইয়া। এই দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের মাঠে চলছে প্রতিযোগিতা দিয়ে প্রচার ও গণসংযোগ। নির্বাচনের তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হেলালউদ্দিন ও গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবুল বাশার ভূঁইয়া প্রচার চালাচ্ছেন। তবে জাতীয় পার্টি ও এনসিপিসহ অন্য দলের প্রার্থিতা এখনও দেওয়া হয়নি। এখানে ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৮৩১ জন ভোটার রয়েছেন।
লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসন : বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি দলীয় প্রার্থিতা পেয়ে ধানের শীষে ভোট চেয়ে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তিনি আসনটির সাবেক দুবারের সংসদ সদস্য। ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে শুরু করে তিনি এখন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছেন। নির্বাচনী এলাকাসহ সারাদেশেই তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়। তবে এবারের নির্বাচন কঠিন ও অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে দাবি করে নির্বাচনী মাঠে সর্বোচ্চ কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। প্রতিদিনই সভা, উঠান বৈঠক, ওয়াজ-মাহফিলসহ গণসংযোগ করে মানুষের কাছে তিনি আগামীর বাংলাদেশ গড়তে তারেক রহমানের ৩১ দফা তুলে ধরছেন। দুবারের সংসদ সদস্য থাকাকালে নির্বাচনী এলাকায় তার ব্যাপক উন্নয়ন রয়েছে। এখানকার পুরাতন-নতুন ভোটাররা তাকে খুব কাছ থেকেই চেনে বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। সব মিলিয়ে ভোটারদের কাছে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন এ্যানি।
এদিকে বিগত দিনে জোটের সঙ্গী হলেও এবার বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত। এ আসনে ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনী এলাকায় প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তুলে ধরছেন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। আসনটি জামায়াতের ঘরে নিতে ব্যাপক কাজ করছেন রেজাউল করিম।
এখানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী দলের জেলা সভাপতি অনারারি ক্যাপ্টেন (অব.) মোহাম্মদ ইব্রাহীম, জাতীয় পার্টির জেলা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাকিব হোসেন ও গণঅধিকার পরিষদের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মুরাদ হোসেন দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। নামমাত্র কার্যক্রম পরিচালনা করছে এসব দল। এখানে এনসিপির প্রার্থী দেওয়া হয়নি। তবে কয়েকজন মনোনয়ন চাচ্ছেন বলে জানা গেছে। এখানে ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৭২৮ জন ভোটার রয়েছেন।
লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি ও কমলনগর) আসন : বিএনপির সহ-শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক এবং এ আসনের সাবেক দুবারের সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান দলীয় মনোনয়ন পেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার দাবি দল থেকে তাকে গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া হয়েছে। এ জন্য তিনি রামগতি ও কমলনগর উপজেলার প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে উঠান বৈঠক করেছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সিনিয়র সহসভাপতি তানিয়া রব নির্বাচন করবেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলক সাবেক দুবারের মন্ত্রী জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রবের সহধর্মিণী। রব অসুস্থ থাকায় তার পরিবর্তে তানিয়া শরিক দলের প্রার্থিতা চাচ্ছেন। প্রায় ৩ মাস ধরে নির্বাচনী এলাকায় সভা-উঠান বৈঠক ও জনসভা করে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। স্থানীয় বিএনপির একাংশ তাকে ব্যাপক সমর্থন দিচ্ছেন। এ জন্যই তিনি বিএনপি নেতা নিজানের সঙ্গে সমানে সমানে পাল্লা দিচ্ছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
এখানে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর সহধর্মিণী ও অর্পণ আলোক সংঘের প্রতিষ্ঠাতা বীথিকা বিনতে হোসাইনও বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাচ্ছেন। নির্বাচনী এলাকায় কয়েকটি সভায় তিনি যোগ দিয়ে নির্বাচনী বার্তা জানান দিয়েছেন।
এদিকে এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এআর হাফিজ উল্যাহ নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তবে এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী দলের সাবেক উপদেষ্টা এবং কমলনগর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ মনোনয়ন পেয়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তৎপর রয়েছেন। এখানে গণঅধিকার পরিষদ ও এনসিপি থেকে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।