অনলাইন ডেক্স :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আরপিওর বিষয়গুলো মাথায় রেখে মিত্রদের সঙ্গে ‘আসন সমঝোতা’ করতে চায় বিএনপি। বিষয়টি সুরাহা করতে আজ থেকে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসছে দলটি। বুধবার ১২ দলীয় জোটের সঙ্গে বৈঠক করবে বিএনপি। এক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থী এবং সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশÑ আরপিও বিবেচনায় নিয়ে মিত্রদের মধ্যে কেবল ‘বিজয়ী হতে পারার মতো’ নেতাদেরই আসন ছাড়ার পক্ষে দলটি। কারণ শুধু আসন ছাড়লেই হবে না, তাদেরকে জিতিয়েও আনতে হবে। দলটি চায় না, মিত্রদের জন্য ছাড়া আসন জামায়াতের কাছে চলে যাক। একই সঙ্গে জোটের ঐক্যও ‘যৌক্তিকভাবে’ টিকিয়ে রাখতে চায় তারা। এক্ষেত্রে জোটের সিনিয়র নেতা, কিন্তু ভোটের মাঠে যাদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কমÑ তাদেরকে সংসদের উচ্চকক্ষসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানোর প্রস্তাব দেবে বিএনপি।
গত সোমবার রাতে রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে বৈঠকসূত্র জানিয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি বৈঠকে যোগ দেন এবং সভাপতিত্ব করেন।
নির্বাচন সামনে রেখে গত ৩ নভেম্বর প্রথম পর্যায়ে ২৩৭ আসনে দলের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছিল বিএনপি। পরে একটি আসন স্থগিত করা হয়েছে। এর এক মাস পর দ্বিতীয় দফায় গত ৪ ডিসেম্বর আরও ৩৬ আসনে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়। সে হিসাবে মোট ২৭২ আসনে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে বিএনপি। এখন ফাঁকা রয়েছে ২৮টি আসন। বিএনপি থেকে বলা হয়েছে, ফাঁকা আসনগুলোতে দলীয়সহ মিত্ররা নির্বাচন করবেন।
যদিও ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের অভিযোগ, নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির চাওয়া অনুযায়ী দল ও জোটের প্রার্থী তালিকা জমা দিলেও তাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই ২৭২ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। এমন সিদ্ধান্তে তারা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। দুই দফায় ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় অন্তত ছয়টি আসনে ‘অনিবন্ধিত’ মিত্ররা ধানের শীষের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। আসনগুলো হলোÑ কুষ্টিয়া-২, মৌলভীবাজার-২, নড়াইল-২, কিশোরগঞ্জ-৫, ঝালকাঠি-১ এবং যশোর-৫। এসব আসনে দলীয় নেতাদের প্রার্থী করেছে বিএনপি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
জানা গেছে, শরিকদের কাক্সিক্ষত আসনগুলো যেখানে বিএনপি ইতোমধ্যে তাদের দলীয় প্রার্থীকে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে দু-একটিতে ‘মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার’ চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ‘যৌক্তিকভাবে’ জোটের ঐক্য ধরে রাখতে চায় বিএনপি। তাই মিত্রদের মধ্যে যাদেরকে শেষ পর্যন্ত আসন ছাড়া সম্ভব হবে না, আগামীতে সরকার গঠন করলে তাদেরকে যোগ্যতা অনুযায়ী যথাযথ মূল্যায়ন করবে দলটি।
জানা গেছে, বৈঠকে নির্বাচন সামনে রেখে মিত্রদের সঙ্গে আসন সমঝোতা বা আসন বণ্টনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দূরত্ব নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বাধীন কমিটি যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধান করবে। এর অংশ হিসেবে আজ বুধবার ১২ দলীয় জোটের সঙ্গে বৈঠক করবে বিএনপি। এ ছাড়া দ্রুততম সময়ে পর্যায়ক্রমে গণতন্ত্র মঞ্চ ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সঙ্গেও বসবে দলটি।
শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টনে সংশোধিত আরপিওর বিষয়টি ভাবাচ্ছে বিএনপিকে। কারণ, সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী নির্বাচনে নিবন্ধিত একাধিক দল জোটভুক্ত হলেও ভোট করতে হবে নিজ নিজ দলের প্রতীকে। অথচ আগে কোনো দল জোটভুক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে তারা জোটের শরিক যে কোনো দলের প্রতীক নেওয়ার সুযোগ পেত। তাই আগামী নির্বাচনে প্রতীক একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছে বিএনপি। দলটির নেতারা মনে করছেন, এ অবস্থায় শরিক অন্য দলগুলোর প্রতীককে নির্বাচনী মাঠে পরিচিত করানো কঠিন হবে। ধানের শীষের পক্ষে নেতাকর্মীদের যেভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নামানো যাবে, অন্য দলের প্রতীকের পক্ষে সেভাবে নামানো সম্ভব হবে না। তার পরও জোটের ঐক্যের স্বার্থে শরিক দলগুলোর মধ্যে যারা খুব পরিচিত মুখ, মাঠপর্যায়ে অবস্থান আছে, যারা বিজয়ী হয়ে আসতে পারেন- তাদেরকেই আসন ছাড়বে বিএনপি।
অবশ্য স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এক নেতা বলেছেন, যেহেতু দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে যুগপৎ আন্দোলনের মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। তাই নিশ্চিত পরাজয় জেনেও ধানের শীষবিহীন মিত্রদলের প্রার্থী করা সঠিক হবে না। সেক্ষেত্রে নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করা যেতে পারে। এই প্ল্যাটফর্মের নাম হতে পারে ‘ডেমোক্রেটিক রিফর্ম অ্যালাইন্স’। এই প্ল্যাটফর্মে মিত্র রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ক্ষমতায় গেলে উচ্চকক্ষসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। তবে এই প্রস্তাব নিয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিস্তারিত কোনো আলোচনা হয়নি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, আসন বণ্টন বা সমঝোতা নিয়ে সব শরিকের সঙ্গে অসন্তোষ-সমস্যা হয়নি, কিছু কিছু শরিকের সঙ্গে হয়েছে। এলডিপিসহ দু-একটি ইসলামি দলের সঙ্গে তাদের মোটামুটি বোঝাপড়া আছে। সংশ্লিষ্ট আসনে বিজয়কে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যারা বিজয়ী হতে পারবে, তাদের দেওয়া হবে। বাকিদের অন্যভাবে সম্মান জানানো হবে।
এদিকে বৈঠকে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দলের যেসব প্রতিশ্রুতি আছে, তার মধ্যে সরকার গঠন করলে বিভিন্ন সেক্টরে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, ক্রীড়াসহ অন্তত ৮টি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি যাতে প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যায়, সে জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ নেবে বিএনপি। এ লক্ষ্যে লিফলেট বিতরণ থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপন দেওয়া এবং পেশাজীবী ও নেতাকর্মীদের মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। নির্বাচনের তফসিলের পরই তারা এ কাজে নেমে পড়বে।
বৈঠকে নির্বাচনের তফসিল নিয়েও আলোচনা হয়। চলতি সপ্তাহের মধ্যে অর্থাৎ আজ বা কালের মধ্যে এই তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। বিএনপি মনে করছে, তফসিলের মধ্য দিয়ে দেশ পুরোপুরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢুকে যাবে।
বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে স্থায়ী কমিটিকে ব্রিফ করেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। তিনি জানান, বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেনÑ তাকে কীভাবে সুস্থ করে তোলা যায়। আপাতত তাকে লন্ডনে নেওয়া হচ্ছে না।