প্রকাশিত : ০৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১০:০৪ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

৪ আসনেই হবে লড়াই, চা শ্রমিকের ভোটই ফয়সালাকারী

আয়কর বার্তা রিপোর্ট:

ফেব্রুয়ারির নির্ধারিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মৌলভীবাজারের রাজনীতি এখন উত্তপ্ত ও অস্থির। চারটি আসনজুড়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির তৎপরতা নজর কাড়ছে। বিশেষ করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন, জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা, নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর উত্থান, প্রবাসী নেতাদের প্রভাব এবং চা শ্রমিক সম্প্রদায়ের ভোটÑ সব মিলিয়ে সিলেট বিভাগের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে মৌলভীবাজার। এ জেলার চার আসনেই এবারের লড়াই হবে।

মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী)

বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার সমন্বয়ে গঠিত এ আসনে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার। দীর্ঘদিন ধরে দুই উপজেলার রাজনৈতিক ভারসাম্য ও ধর্মীয় ভোটব্যাংক। এই আসনে সিলেট বিভাগের অন্যতম আলোচিত আসনে পরিণত করেছে।

বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সাবেক সহসভাপতি নাসির উদ্দিন আহমদ মিঠু ইতোমধ্যে মাঠে সরব। ২০১৮ সালের প্রতিকূল নির্বাচনে প্রায় ৭০ হাজার ভোট পেয়ে তিনি তৃণমূলে অবস্থান শক্ত করেছিলেন। বর্তমানে ইউনিয়নভিত্তিক গণসংযোগ, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও চা শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করছেন নিয়মিত। তবে কাতার বিএনপির নেতা শরিফুল হক সাজুর অনুসারীরা এখনও মূল প্রচারে নেই। যদিও তারা স্থানীয়ভাবে ধানের শীষের পক্ষে অনুষ্ঠান করছেন। তাই শেষ পর্যন্ত ঐক্য কতটা হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা আমিনুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরেই হাট-বাজার ও মসজিদভিত্তিক প্রচার চালাচ্ছেন। তার দাবি, চাপের মধ্যেও অতীতে সমর্থন ছিল, এবার তা দ্বিগুণ হয়েছে।

যদিও জামায়াত কখনও এ আসনে জয় পায়নি। তবে এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আগের তুলনায় শক্তিশালী হবে বলে স্থানীয়দের মত।

এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, খেলাফত মজলিস, জমিয়ত- এসব দলের একাধিক প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। বিশেষ করে এনসিপির তামিম আহমদ ও গণঅধিকার পরিষদের আব্দুন নূর তালুকদার তরুণ ভোটারদের নিয়ে কাজ করছেন।চা শ্রমিক ভোট, প্রবাসী জনসংযোগ বিষয়েই নির্ধারণ করবে শেষ মুহূর্তে কার পাল্লা ভারী।

মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া)

কুলাউড়ায় ভোটার সংখ্যা তিন লাখের বেশি। উপজেলায় রাজনৈতিকভাবে সচেতন, পাশাপাশি হাওর-বাগান-পাহাড়ের মিশেল এ জনপদকে করেছে বহু রাজনৈতিক দলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

বিএনপির মনোনীত প্রার্থী শওকতুল ইসলাম শকু, যুক্তরাজ্য প্রবাসী। তবে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় আবেদ রাজা মনোনয়ন না পাওয়ায় তার সমর্থকদের মাঝে ক্ষোভ রয়েছে। তারা ইতোমধ্যে মোটরসাইকেল শোডাউনসহ পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।

বর্তমান জামায়াতে ইসলামী জেলা আমির ইঞ্জিনিয়ার এম শাহেদ আলী আনুষ্ঠানিক প্রার্থী হলেও কেন্দ্রীয় আমির ডা. শফিকুর রহমানের ঘন ঘন এলাকায় আসা-যাওয়া রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আঞ্জুমানে আল ইসলাহ, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন, জমিয়তÑ সব দলেরই সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছে। ফলে ভোট ভাগাভাগির আশঙ্কা প্রবল।

মূলত বিএনপি ও জামায়াত মুখোমুখি হলেও চা শ্রমিক সম্প্রদায়ের ভোটই শেষ মুহূর্তে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর)

এই আসনে ১৯৮৬ থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সাতবার জয়ী হলেও, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিজয়ী হয় বিএনপি। এ আসনেই রাজনীতির কিংবদন্তি প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান নির্বাচিত হয়েছিলেন।এবার দলের একমাত্র মনোনীত প্রার্থী এম নাসের রহমান। দলের বড় অংশই তার পক্ষে থাকলেও জেলা কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় না করায় কিছুটা অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াতের প্রার্থী সাবেক জেলা আমির আব্দুল মান্নান মাঠে রয়েছেন নিয়মিত। গণঅধিকার পরিষদের অপু রায়হান এ আসনে সক্রিয়ভাবে তরুণ ভোটারদের সঙ্গে কাজ করছেন।

এই আসনে কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকায় বিএনপি সুসংহত। তবে আওয়ামী লীগের স্থানীয় জনভিত্তি এবং চা শ্রমিক ভোটের প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও সাবেক এমপি এম নাসের রহমান বলেন, দেশে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সুরক্ষার দায়িত্ব বিএনপি নেবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটারদের নিরাপত্তা দিতে হলে বিএনপিই দেবে।

মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ)

এ আসনটিই বর্তমানে জেলার সবচেয়ে আলোচিত। কারণ এখানে বিএনপির ভেতরে প্রকাশ্য বিভাজন দেখা দিয়েছে। মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলহাজ মুজিবুর রহমান চৌধুরী।

কিন্তু শ্রীমঙ্গল পৌরসভার বহুবারের মেয়র মহসিন মিয়া মধু মনোনয়ন না পেয়ে স্বাধীন প্রার্থী হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, মনোনয়ন পাই বা না পাইÑ নির্বাচনে আছি এবং থাকব। এ অবস্থায় আসনটিতে ধানের শীষের দুটি পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে।

জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আব্দুর রব নিয়মিত সভা-সমাবেশ করছেন। তিনি চা বাগান এলাকাগুলোয় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। গণঅধিকার পরিষদ দলের প্রার্থী হারুনুর রশিদ, বর্তমানে শ্রীমঙ্গল উপজেলাভিত্তিক বৈঠক করছেন। নতুন শক্তি হিসেবেই আলোচনায় প্রীতম দাশ, যিনি প্রতিদিন চা বাগান ও বিভিন্ন ইউনিয়নে গণসংযোগ করে দলকে চাঙা রাখছেন।

স্থানীয়দের মতে, মৌলভীবাজার-৪ এর মূল লড়াই দাঁড়িয়েছে, বিএনপি বনাম বিএনপি বনাম নতুন দল এনসিপি। তবে চা শ্রমিক ভোট এ আসনের সবচেয়ে বড় ফয়সালাকারী শক্তি।

মৌলভীবাজারের চারটি আসনেই এখন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিএনপি-জামায়াতের লক্ষ্য আওয়ামী লীগের ঘাঁটি দখল, আর নতুন দলগুলোর লক্ষ্য টিকে থাকা। চা শ্রমিকদের ভোটব্যাংক, তরুণদের অংশগ্রহণ, সামাজিক মাধ্যমে প্রচার, প্রবাসী নেতাদের সক্রিয়তাÑ সব মিলিয়ে আসন্ন নির্বাচন ঘিরে জেলার রাজনীতি এখন টান টান উত্তেজনায় ভরপুর।

চা শ্রমিক ভোট, প্রবাসী প্রভাব, তরুণ ভোটার এবং দলীয় ঐক্যÑ এই চার ফ্যাক্টরই নির্ধারণ করবে মৌলভীবাজারের চারটি আসনের রঙ।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়