প্রকাশিত : ০৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৯:৫০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ভোটে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণের বার্তায় রাজনীতিতে চাঞ্চল্য

আয়কর বার্তা রিপোর্ট

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির (জাপা) অংশগ্রহণ এখনও প্রায় অনিশ্চিত। যদিও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পর জাপাবিহীন ভোট অনেকটাই একতরফা হবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ইতোমধ্যে জাতীয় পার্টিসহ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিকদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে মাঠে সক্রিয় রয়েছে জামায়াতসহ আটটি রাজনৈতিক দল। জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি এবং গণঅধিকার পরিষদও এমন দাবিতে সরব। এ অবস্থায় জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেÑ উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের এমন বক্তব্যে রাজনীতিতে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর জোট ও ভোটের সমীকরণ পাল্টে যাবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, জাপার অংশগ্রহণ শুধু মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতাই বাড়াবে না, নির্বাচনী যাত্রায় দেখা যাবে নতুন মোড়। তবে জাতীয় পার্টি বলছে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হলে তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না।

গতকাল শুক্রবার সকালে মাগুরা সরকারি বালক বিদ্যালয় মাঠে আন্তঃকলেজ ফুটবল টুর্নামেন্ট উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, জাতীয় পার্টি স্বৈরাচারের দোসর। যদিও একে ব্যান্ড করা হয়নি। তবে তাদের ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট। জাতীয় পার্টি যদি ইলেকশন করতে চায় সেটা তাদের ইচ্ছা। আমরা সব সময় বলব, ইতিহাস বলবে জাতীয় পার্টি স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড় দোসর ছিল।

একই দিনে দেশের একটি গণমাধ্যমকেও শফিকুল আলম বলেন, আওয়ামী লীগ না পারলেও জাতীয় পার্টিকে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেবে না সরকার। তিনি জানান, আইনিভাবে নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলই অংশ নিতে পারবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেন, নির্বাচন করার ক্ষেত্রে আইন তো তাদের বাধা দেয়নি। তবে আওয়ামী লীগের বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট, রিফাইন্ড বা অন্য কোনো নামেও দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। তারা আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।

জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রশ্নে রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর দিলারা চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি যদি অংশ নিতে পারে, তাহলে আওয়ামী লীগের জন্য একটা স্পেস তৈরি হবে। আওয়ামী লীগের লোকজন তাদেরকেই ভোট দেবে। পাশাপাশি প্রো-ইন্ডিয়ান একটি গ্রুপ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার

মধ্যে থাকতে পারবে। যেহেতু জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হয়নি। ফলে তারা তো নির্বাচনে অংশ নিতেই পারে।

দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকলেও এক সুরে জাপা : এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জিএম কাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি এবং ব্যারিস্টার আনিসুর ইসলাম মাহমুদ জাতীয় পার্টির নেতারা ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কথা বললেও তাদের বক্তব্যে নির্বাচনমুখিতা স্পষ্ট। উভয় অংশের নেতারা নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে ভেতরে ভেতরে নিজেদের প্রার্থীও ঠিক করছেন। গ্রিন সিগন্যাল পেলে তাদের নির্বাচনের প্রস্তুতি দৃশ্যমান হবে। তবে এর আগে জাপার উভয় অংশের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যে মামলা রয়েছে তা উঠিয়ে নেওয়ার বিষয়েও জোর দাবি জানানো হবে।

নির্বাচনের প্রস্তুতি যেমন চলছে, একইভাবে জাপার অন্য অংশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বও দৃশ্যমান হচ্ছে। একদিকে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির (জেপি) সঙ্গে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের জাতীয় পার্টির জোট গড়ার আলোচনা জোরালো হচ্ছে। পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়ায় জিএম কাদেরের নেতৃত্ব থেকে দলীয় প্রতীক লাঙ্গল নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ অংশ। এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক এবং দশম কাউন্সিলের বৈধতা বিষয়ে অবশেষে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ফয়েজ আহমেদের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে রুল জারি করে জানতে চেয়েছেনÑ কেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় পার্টির কাউন্সিলকে বৈধতা দেওয়া হবে না। কেন তাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিকে লাঙ্গল প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে না, তারও ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনকে। ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন দলের দপ্তর সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক জানান, এই বিষয়ে জাতীয় পার্টির পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার জিয়াউল করিম খান।

অন্যদিকে নির্বাচনের প্রস্তুতি স্বরূপ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় পার্টির (জাপা) একাংশের চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক দল জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠিত হচ্ছে। জোটের মুখপাত্র করা হচ্ছে জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে। ১৬টি দলের সমন্বয়য়ে গঠিত এই জোটের সম্ভাব্য নাম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক জোট’। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জানান, জোটের মূলমন্ত্র হবে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, উদার গণতন্ত্র ও সকল ধর্মের মানুষের সহাবস্থান।

একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে এমন কোনো দলের সঙ্গে জোটে যেতে পারে জিএম কাদের নেতৃত্বাধীন জাপা। জিএম কাদের আমাদের সময়কে বলেন, ‘মাঠের পরিস্থিতি জরিপ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পারফরম্যান্স দেখে ভোটের নিরাপত্তা, প্রার্থীর নিরাপত্তা, ভোটারদের নিরাপত্তা, পোলিং এজেন্টদের নিরাপত্তাÑ এগুলো সবকিছু দেখে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।’ একইভাবে জাপার অন্য অংশের মহাসচিব এবিএম রহুল আমিন হাওলাদারও মনে করেন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হলেই তারা নির্বাচনে অংশ নেবেন।

১৪ দলের মধ্যে কেবল সক্রিয় আছে জেপি : গণ-অভ্যুত্থানে পরাস্ত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়নি। তবে তাদের নিষিদ্ধ করার দাবি অব্যাহত রয়েছে। জানা গেছে, ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে জেপি ছাড়া প্রায় সব দলের নেতাকর্মী পলাতক। জাসদ (ইনু), ওয়ার্কার্স পার্টিসহ (মেনন) ১৪ দলের শরিকদের অফিস বন্ধ। বেশ কয়েকটি অফিস ইতোমধ্যে ‘দখল’ হয়ে গেছে।

কিন্তু ১৪ দলের শরিক জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুসহ তার দলের নেতাকর্মীরা রাজনীতির মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তিনি জাপার একটি অংশের সঙ্গে জোটে যাওয়ার সম্মতিও দিয়েছেন।

এদিকে জুলাই অভ্যুত্থান ইস্যুতে হত্যা মামলা, হত্যার হুমকিসহ নানা মামলা জাপার দুই অংশের নেতাদের নামে থাকলেও ‘দৃশ্যমান চাপ’ কেবল জিএম কাদের ও তার নেতাকর্মীদের ওপর। অন্য অংশ (আনিসুল-হাওলাদার) প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে দেখা যাচ্ছে। তবে একাধিকবার পার্টি অফিস পুড়ালেও তা দলের নেতারা সংস্কার করে আবার অফিসে রাজনৈতিক মিটিং করছেন জিএম কাদের নেতৃত্বাধীন জাপার নেতারা। এমন বাস্তবতায় রাজনীতিতে কৌতূহল বাড়ছে।

জাপার দুই অংশের নেতাদের বিশ্বাস, জুলাই সনদের প্রশ্নে কিংবা নির্বাচন কমিশনের সংলাপে আমন্ত্রণ না পেলেও শেষ পর্যন্ত তারা নির্বাচনের সুযোগ পাবেন।

জাতীয় পার্টিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে তারা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলের নেতারা নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে ভোটারের উপস্থিতি কমতে পারে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ইস্যুতে উঠতে পারে না প্রশ্ন। ফলে কোন একটা ফরমেটে জাপা ও ১৪ দলের দুয়েকটি দল অংশ নিলে আওয়ামী মনস্ক ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসতে পারে। এমনকি সংসদে বিরোধী রাজনীতির ভূমিকাও রাখতে পারে।

এই নেতাদের ভাষ্য, বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো একটি প্ল্যাটফর্মে, বামজোটের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী সমঝোতা, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ইসলামিক ও অন্যান্য দলের সম্মিলিত জোট বা সমঝোতার পর জাপা নেতৃত্বাধীন জোট ভোটে এলে বাদবাকি পরিবেশ আয়ত্তে আসবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়