প্রকাশিত : ০৩ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১০:০৮ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন খালেদা জিয়া

রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন। তবে, তিনি এখনও ঝুঁকিমুক্ত নন। গত ২৩ নভেম্বর থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্ববধানে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। এর মধ্যে ২৭ নভেম্বর থেকে তিনি সিসিইউতে মেডিক্যাল বোর্ডের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।

এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসা সহায়তায় যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের একটি দল গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় এসেছে। এর আগে চীন থেকে আসা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল তাঁর মেডিক্যাল বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। একই সঙ্গে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুতি রেখেছে বিএনপি। তাঁর শারীরিক অবস্থা ও মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর এটি নির্ভর করছে। অন্যদিকে, সোমবার খালেদা জিয়াকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করার পর গতকাল থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) নিরাপত্তা দেওয়া শুরু করেছে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের স্বাস্থ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ব্রিফ করেন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এজেডএম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে ডাক্তাররা যে চিকিৎসা দিচ্ছেন, সেই চিকিৎসা উনি গ্রহণ করতে পারছেন। অথবা আমরা যদি বলি মেনটেইন করছেন। বিভিন্ন ধরনের গুজব, বক্তব্য, বিভিন্ন জায়গায় দেখার পরিপ্রেক্ষিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সার্বক্ষণিকভাবে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার তদারকি করছেন। চিকিৎসার সব বিষয়ে উনি দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সঙ্গে আমাদের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন।

ডা. জাহিদ জানান, চেয়ারপারসনের চিকিৎসায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন, কাতার, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও ভারত ইতোমধ্যে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে। তাঁকে দেশের বাইরে নেওয়ার জন্য যে কথাটি আমি পূর্বেও বলেছি, মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যরা উনাকে দেখেছেন। আজকেও (মঙ্গলবার) ইউকে থেকে ওনাকে দেখার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আসবেন এবং ওনারা দেখবেন। পরবর্তীতে ওনাকে যদি ট্রান্সফারেবল (স্থানান্তরযোগ্য) হয়, যদি ট্রান্সফার করার প্রয়োজন পড়ে, মেডিক্যাল বোর্ড মনে করে; তখনই তাঁকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে।

এই যাত্রায় খালেদা জিয়ার সুস্থ হয়ে ওঠার আশাবাদ ব্যক্ত করে জাহিদ হোসেন বলেন, আমরা এই সংকটময় মুহূর্তে আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে ওনার সুস্থতার জন্য দোয়া চাই এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছায় দেশবাসীর দোয়া, সারা পৃথিবীর অনেক মানুষের ওনার প্রতি ভালোবাসা ও দোয়ার কারণেই হয়তোবা উনি সুস্থ হয়ে উঠবেন বলে আমরা আশা করি। তাঁর ব্যাপারে আমাদের সব প্রস্তুতি আছে, কিন্তু সর্বোচ্চটা মনে রাখতে হবে যে, রোগীর বর্তমান অবস্থা এবং সর্বোপরি মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শের বাইরে কোনো কিছু করার সুযোগ এই মুহূর্তে আমাদের নেই।

খালেদা জিয়াকে নিয়ে গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ডা. জাহিদ বলেন, সবাইকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং সেই সঙ্গে কোনো ধরনের গুজব ছড়ানো এবং গুজবে কান না দেওয়ার জন্য পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে অনুরোধ করছি। আমাদের দল কীভাবে আপনাদেরকে ইনফরমেশন দেবে, সেটিও দলের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ব্রিফিংয়ের একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, আপনাদের ভালোবাসা, সহযোগিতা এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অশেষ মেহেরবানিতে আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে আজ দেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতীক, সেটি প্রমাণিত। সেই লক্ষ্যেই আমরা আপনাদের সহযোগিতা চাই। আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করেছেন ধৈর্য ধারণ করার জন্য। উনি বিরামহীনভাবে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিক্যাল টিমের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। কাজেই আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া চিকিৎসা কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।

ডা. জাহিদ জানান, অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিক্যাল বোর্ড খালেদা জিয়ার চিকিৎসাসেবায় কাজ করছেন। এ মেডিক্যাল বোর্ড রয়েছেন, অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী, অধ্যাপক নুরুদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক একিউএম মহসিন, অধ্যাপক শামসুল আরেফিন, অধ্যাপক জিয়াউল হক, অধ্যাপক মাসুম কামাল, অধ্যাপক এজেডএম সালেহ, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইফুল ইসলাম ও ডাক্তার জাফর ইকবাল। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে অধ্যাপক হাবিবুর রহমান, অধ্যাপক রফিকউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক জন হ্যামিল্টন, অধ্যাপক হামিদ রব, যুক্তরাজ্য থেকে অধ্যাপক জন প্যাট্রিক, অধ্যাপক জেনিফার ক্রস এবং খালেদা জিয়ার পুত্রবধূ ডাক্তার জুবাইদা রহমান।

এদিকে বিএনপির চেয়ারপারসনকে বিদেশে নেওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের পর তারেক রহমান দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে শিগগির দেশে ফিরবেন তিনি (তারেক রহমান)। গতকাল সন্ধ্যা ছয়টার দিকে বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে উদ্ধৃত করে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানানো হয়।

তারেক রহমান এক-এগারোর পর ২০০৮ সালে কারাগার থেকে বেরিয়ে সপরিবার যুক্তরাজ্যে যান। তার পর আর দেশে ফেরেননি। বিদেশে থেকেই দল পরিচালনা করে আসছেন।

রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে গতকাল ফিউচার বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জ ২০২৫-এর গ্র্যান্ড ফিন্যালে অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে কিছু লোক অতি আগ্রহ প্রকাশ করছে উল্লেখ করেন তিনি বলেন, এটার দরকার নেই। তিনি কবে আসবেন, সেটা তাঁর ও পরিবারের সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। সামাজিক মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যেই তারেক রহমান দেশে ফিরছেন, এমন আলোচনার বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে আমীর খসরু বলেন, আমার এ রকম কিছু জানা নেই। ও রকম কোনো কিছু আমাদের কালকের মিটিংয়েও আলোচনা হয়নি।

সরকারের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে ট্রাভেল ভিসা দেওয়ার কথা কেন বলা হচ্ছে, জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, আমার জানা নেই, সরকার কেন বলছে। সুতরাং আমি কমেন্ট করতে পারব না। যারা বলছে, তাদের জিজ্ঞেস করলে ভালো হয়। এখন তারেক রহমান দেশে না এলে সামনের নির্বাচনে প্রভাব পড়বে কিনা, জানতে চাইলে আমীর খসরু বলেন, রাজনীতি এত সহজে প্রভাব পড়ার কোনো বিষয় নয়। বিএনপি এ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। মানুষের আস্থা নিয়ে রাজনীতি করে। বাংলাদেশের মানুষের আস্থা বিএনপি। বিএনপির নেতৃত্ব দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও জিয়াউর রহমানের প্রতি আস্থা আছে। এটা বাংলাদেশের মানুষ যখনই সুযোগ পেয়েছে, প্রমাণ করেছে। ইনশা আল্লাহ, আগামী দিনেও প্রমাণ করবে।

খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টুইট করার বিষয়ে জানতে চাইলে আমীর খসরু বলেন, নরেন্দ্র মোদি একা নন, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেকে তাঁর সুস্থতা কামনা করেছেন। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের জনগণের জন্য কী করেছেন, গণতন্ত্রের জন্য কী করেছেন, এটা আজ সর্বস্বীকৃত এবং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পাচ্ছে। একজন রাজনীতিবিদের জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছু থাকে না।

সুস্থতা কামনায় দোয়া ও মোনাজাত : খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করে গতকাল রাজধানীর শ্যামলীতে নিজ বাসভবনে কোরআন খতম ও সাদাকায়ে জারিয়া দিয়েছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া এ দেশের মানুষের আস্থার প্রতীক। বহু সংকটময় সময়ে তিনি জনগণকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, কখনও দেশ ত্যাগ করেননি। তাঁর অসুস্থতায় শুধু বিএনপি নয়, সারাদেশের সাধারণ জনগণ গভীর উদ্বেগ ও সমবেদনায় আক্রান্ত। এ ছাড়াও বিকালে নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পৃথকভাবে জাতীয়তাবাদী যুবদল ও ছাত্রদল দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে। এ সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

খোঁজ নিতে ভিড় : চিকিৎসাধীন বিএনপির চেয়ারপারসনের খোঁজ নিতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ভিড় করছেন দলের নেতাকর্মীরা। অন্যান্য দিনের মতো গতকালও সারা দিন হাসপাতালের সামনে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ভিড় দেখা গেছে। তারা বলেন, ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) খোঁজ এবং তাঁর জন্য দোয়া করতে এসেছি। ম্যাডাম দ্রুত সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসুন, সেই দোয়া করছি। আশা করছি, তিনি সুস্থ হয়ে আবারও দেশের হাল ধরবেন। আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন।

এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখতে এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়েছেন এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রুকনুজ্জামান, লেফটেন্যান্ট (অব.) সাইফুল্লাহ খান সাইফ, লেফটেন্যান্ট (অব.) কর্নেল আতিক, স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) শামিম ও পেটি অফিসার (অব.) জাহিদুল ইসলাম। তাঁরা খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।

এ ছাড়া খালেদা জিয়াকে দেখতে গত রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালে গেছেন সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান। রাত ৯টার দিকে হাসপাতালে প্রবেশ করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি হাসপাতাল ত্যাগ করার পর আসেন নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান। তিনি বের হয়ে যাওয়ার পর বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন হাসপাতালে প্রবেশ করেন।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়