আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারের দৃষ্টি আকর্ষণে প্রচার-প্রচারণায় নতুনত্ব আনতে বিএনপিতে চলছে নানা পরিকল্পনা। ক্ষমতায় গেলে দলটি কী করবে- তা ভোটারের মধ্যে সহজ-সরল ভাষায় তুলে ধরতে চায় দলটি। বিশেষ করে জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, কৃষি, নারীর ক্ষমতায়ন, ক্রীড়া ও ধর্মীয় বিষয়ে বিএনপির অবস্থান কী হবে- সে বিষয়ে দলের সংশ্লিষ্টদের বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ জন্য ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ শীর্ষক ছয় দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে ২১ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
এদিকে ক্ষমতায় গেলে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে কীভাবে ধারণ করা হবে, এ জন্যও পৃথক কর্মসূচির মাধ্যমে সুস্পষ্ট বার্তা দিতে চায় বিএনপি। দলটির নেতারা জানান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ধারণ করে পথ চলবে বিএনপি। সরকারে গেলেও এ অবস্থান ধরে রাখা হবে। সেই বার্তা দিতে বিজয়ের মাসে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাইযোদ্ধাদের হাতে মশাল তুলে দেবে দলটি। চট্টগ্রামের বিপ্লব উদ্যান থেকে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের ১ তারিখ থেকে এ কর্মসূচি শুরু হবে।
চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহর ২ নম্বর গেট এলাকায় দুই একর জায়গার ওপর ১৯৭৯ সালে বিপ্লব উদ্যান গড়ে তোলা হয়। উদ্যানটি মুক্তিযুদ্ধের এক মহান স্মারক। এ উদ্যান থেকেই পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘উই রিভোল্ট’ বলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। এখান থেকেই ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রথম প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হয়।
বিএনপির নেতারা বলেন, চট্টগ্রাম থেকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আরেকজন জুলাইযোদ্ধা মশাল বহন করে সাংগঠনিক বিভাগ কুমিল্লায় যাবেন। এ মশাল তাঁরা আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাইযোদ্ধার হাতে তুলে দেবেন। এভাবে করে ১০ সাংগঠনিক বিভাগের প্রতিটি শহর ঘুরে আগামী ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় বিজয় সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচির সমাপ্তি টানা হবে। কর্মসূচিতে মূল চমক থাকবে একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং চব্বিশের গণ-অভুত্থানের যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ। মূলত এর মধ্যে দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের প্রচারে নামছে বিএনপি। এ নিয়ে শিগরিগই দলটির সংবাদ সম্মেলনে করার কথা রয়েছে। দলটির একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এ সংক্রান্ত পরিকল্পনায় যুক্ত একাধিক নেতা বলেন, বিজয়ের মাসে এ কর্মসূচির মধ্য দিয়েই ধানের শীষের পক্ষে ঢেউ উঠবে। কর্মসূচি সফল করতে দফায় দফায় বৈঠকও চলছে। বিএনপি সূত্র জানায়, কর্মসূচি সফলে মুক্তিযোদ্ধা দলকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরাও থাকবেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা জানান, জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যাঁরা বেশি পরিচিত, তাঁরা থাকবেন। এর মধ্যে শহীদ মীর মুগ্ধের ছোট ভাই ও সদ্য বিএনপিতে যোগদানকারী মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধও আছেন। এ ছাড়া গত ৮ নভেম্বর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিএনপির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ঘোষণা দেন চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফি আলম, শহীদ মাহমুদুর রহমানের বোন (জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠকারী) সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী, শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বাবা মাহবুবুর রহমান, শহীদ ফয়সাল আহম্মেদ শান্তর বাবা মো. জাকির হোসেন এবং চব্বিশের জুলাই গণ-আন্দোলনে আহত মো. ফারহান জামিল। তাঁরাও এই কর্মসূচিতে থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, সারা দেশে আরও অনেক জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত যোদ্ধাদের বিএনপিতে যোগদান করার কথা রয়েছে। তারাও বিএনপির মশাল প্রজ্বলন কর্মসূচিতে যোগ দেবেন।
৭ থেকে ১৩ ডিসেম্বর ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ শীর্ষক কর্মসূচি
আগামী ৭ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ শীর্ষক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। গতকাল বৃহস্পতিবার জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাঁর নেতৃত্বে ২১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি উপস্থিত থাকবেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
ছয় দিনের এ কর্মসূচি রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, কৃষক দল ও ওলামা দলের উদ্যোগে পৃথকভাবে এ কর্মসূচি হবে; উদ্বোধন করবেন দলের সিনিয়র নেতারা। ৭ ডিসেম্বর প্রথম দিনের কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পর্যায়ক্রমে ৮ ডিসেম্বর দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, ৯ ডিসেম্বর স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ১০ ডিসেম্বর স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ১১ ডিসেম্বর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ১৩ ডিসেম্বর কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা জানান, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আধুনিক ও নিরাপদ দেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে। সেক্ষেত্রে জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষা, শিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি, স্বাস্থ্য, কৃষি, নারী, ক্রীড়া ও ধর্মীয় বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের দেশ গড়ার পরিকল্পনা সম্পর্কিত নানা দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। পরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ শীর্ষক কর্মসূচি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে এবং সদস্য সচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। অন্য সদস্যরা হলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমীন, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হক, ঢাকা জেলার সাধারণ সম্পাদক এবং নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী, নির্বাহী কমিটির সদস্য আবদুস সাত্তার পাটোয়ারি, বগুড়া জেলা বিএনপি নেতা শাহে আলম, যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না, সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী, সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান, কৃষক দলের সভাপতি হাসান জাফির তুহীন, সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির, ওলামা দলের আহ্বায়ক সেলিম রেজা ও সদস্য সচিব কাজী আবুল হোসেন। এ ছাড়া কমিটিতে আছেন ড. সাইমুম পারভেজ. কৃষিবিদ ড. আবদুল মজিদ ও কামরুল ইসলাম।
গতকালের সংবাদ সম্মেলনে রুহুল কবির রিজভী জানান, প্রতিটি কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি উপস্থিত থাকবেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কর্মসূচি সফল করতে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।