অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অবকাঠামো নির্মাণে যথাযথ মানদণ্ড অনুসরণ না করায় বাংলাদেশের প্রধান দুই মেগাসিটি ঢাকা ও চট্টগ্রাম রয়েছে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির উচ্চ ঝুঁকিতে। গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর। এতে সারাদেশে অন্তত ১১ জন মারা যায়, আহত হয় পাঁচ শতাধিক। এরপর মাত্র ৩২ ঘণ্টার মধ্যে আরও তিনবার ভূকম্পন অনুভূত হয়। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবারও সিলেট ও টেকনাফে মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। এমতাবস্থায় জনমনে আতঙ্ক বেড়েই চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি হলে পুরান ঢাকাসহ ঘনবসতিপূর্ণ স্থানগুলোতে উদ্ধারকাজ চালানো খুবই দুরূহ হয়ে পড়বে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতিও হতে পারে।
কীভাবে এসব শহরে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো যায়? প্রতিরোধ ব্যবস্থাই বা কেমন হওয়া উচিত? এমন প্রশ্নে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন ড. মো. রাশিদুল হাসান বলেন, ভূমিকম্পের ক্ষতি কমাতে অবশ্যই পরিকল্পিত নগরায়ণের দিকে আলোকপাত করতে হবে। উপযুক্ত নগর পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি ভবন নির্মাণের সময় ভবনের চারদিকে পরিমিত জায়গা ছাড়তে হবে। একটি পরিকল্পিত শহরে ন্যূনতম ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকতে হবে। দুর্যোগকালে সহজে উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য এবং মানুষ যেন বের হয়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নিতে পারে, সে জন্য গণপরিসরের জায়গা বৃদ্ধি করতে হবে। ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হচ্ছে অনেক বেশি পরিমাণে। এর মাত্রা বেড়ে গেলে মাটির নিচে খালি জায়গা তৈরি হয়, ফলে সেখানে সেটেল ডাউন হয় যেটি ভূমিকম্পের প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারে নজর দিতে হবে।
পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বিষয়ে ড. মো. রাশিদুল হাসান বলেন, রাজউকে যখন মাস্টারপ্ল্যান করা হয় তখন পুরান ঢাকার বড় অংশজুড়ে একটি রিডেভেলপমেন্ট প্ল্যান দেওয়া হয়েছিল। এর আওতায় এ এরিয়াকে ডেমোলিশ করে আমরা বিশাল একটা জায়গায় নতুন সোসাইটি গড়ে দেব, যেখানে থাকবে বহুতল ভবন, খেলার মাঠসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থার জায়গা এখনো দুর্বল হওয়ায় এটি আর অগ্রসর হয়নি। সুতরাং এসব বিষয়ে সরকারকে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে। ঘনবসতিপূর্ণ স্থানগুলোকে ধ্বংস করে রাস্তা চওড়া করতে হবে।
চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. আফতাবুর রহমান বলেন, ভূমিকম্প খুবই অনিশ্চিত একটা দুর্যোগ। এটি যেকোনো সময় হতে পারে। যারা বলে, আগামী তিন দিনে ৩০টা বা ৪০টা ভূমিকম্প হবে এগুলো সম্পূর্ণ ভুল কথা। আবার ফোরশক নাকি আফটার শক, এগুলোও সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারা খুবই কঠিন।
ভূ-প্রকৌশল বিষয়ক এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, জিওটেকনিক্যাল বিষয়টাকে আমরা খুব বেশি ইগনোর করি। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে জিওটেকনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন এবং ফাউন্ডেশনের বিষয়ে প্রপার ইনস্ট্রাকশন দেওয়া আছে। কিন্তু তবুও ঢাকা শহরে অনেক স্থানে জায়গা ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে বেশিরভাগ ভবনের কোনো ডিজাইন নেই। এগুলোর সয়েল টেস্ট হয়নি, জিওটেকনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন হয়নি, যথোপযুক্ত ফাউন্ডেশনও দেওয়া হয়নি। এমনকি ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরিকল্পিত শহরগুলোতেও দায়সারাভাবে মাটি পরীক্ষা হচ্ছে। যদি ভবনের ফাউন্ডেশন অথবা ভূমি ধসে যায় বা তরলীকরণের ঘটনা ঘটে তাহলে ওপরের স্ট্রাকচারও টিকবে না। এখন তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত তদন্ত করে যেসব ভবনের অবস্থা মোটামুটি ভালো সেগুলোকে মজবুতকরণের কাজ করতে হবে এবং যেগুলোর অবস্থা ভালো না সেগুলো ভেঙে ফেলতে হবে।
চুয়েটের ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাংলাদেশ ও দেশের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় মোট ৫টি ভূমিকম্পের উৎস রয়েছে। এসব উৎস থেকে রিখটার স্কেলে ৭.৫ থেকে ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্প উৎপন্ন হতে পারে। তবে কবে হতে পারে সেটি বলা মুশকিল। চট্টগ্রাম শহরের আর্থকোয়েক ড্যামেজ অ্যাসেসমেন্ট করে দেখা গেছে, যদি বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে ভূমিকম্প হয়, তবে চট্টগ্রামের ৪১টি ওয়ার্ডের ২ লাখ ৬২ হাজার ভবনের মধ্যে প্রায় ২ লাখ ভবনই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ২০২০-এ নতুন বিএনবিসি অনুসারে চট্টগ্রামের সিসমিক কোএফিশিয়েন্ট ০.২৮ ধরা হয়েছে, যেখানে ১৯৯৩ বিল্ডিং কোডে এটি ০.১৫। তাহলে আগের এসব ভবনে যে ধরনের ডেফিসিয়েন্সি রয়েছে সেগুলো অ্যাসেসমেন্ট করে শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। মেট্রোরেলকে নিরাপদ করার ক্ষেত্রেও পিলারগুলো অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে। অভিজ্ঞ দল গঠন করে আন্তরিকভাবে কাজ করলে এক সপ্তাহের মধ্যেই এটি সম্ভব।