ইসলাম মানুষকে নানাভাবে সামাজিকতায় উদ্বুদ্ধ করেছে এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয় এমন কাজের নির্দেশ দিয়েছে। তবে কখনও কখনও সামাজিকতা মানুষের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায় এবং তার বলি হয় অসহায় ও নিম্ন আয়ের মানুষ- সেসব কাজ এড়িয়ে চলা ইসলামের নির্দেশ। হাদিসে আছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (স.) মানুষকে উপহার দিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, তোমরা একে অন্যকে উপহার দাও, ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। (আল আদাবুল মুফরাদ : ৫৯৪)
অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, তোমরা একে অন্যকে হাদিয়া-উপহার দাও। এ উপহার অন্তরের শত্রুতা ও বিদ্বেষ দূর করে দেয়। (জামে তিরমিজি : ২১৩০)
উপহার ও উপঢৌকন পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করে এবং পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করে। তবে উপহার আদান-প্রদানে একজন মুমিনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য থাকবে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। নবী কারিম (স.) বলেন, ‘যে লোক আল্লাহর জন্য দান করে, আল্লাহর জন্য দান করা থেকে নিবৃত্ত থাকে, আল্লাহর জন্য ভালোবাসে, আল্লাহর জন্যই ঘৃণা করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিয়ে দেয় সে তার ইমান সুসম্পন্ন করেছে।’ (সুনানে তিরমিজি : ২৫২১)
তবে শুধু উপহারের জন্য দাওয়াত দেওয়া নিন্দনীয়। আর দাওয়াত দেওয়া এবং তা গ্রহণ করা ইসলামি শিষ্টাচারের অংশ। হজরত রাসুলুল্লাহ (স.) দাওয়াত কবুলকে মুসলমানের অধিকার আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের পাঁচটি অধিকার- ১. সালামের জবাব দেওয়া, ২. অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া, ৩. জানাজায় শরিক হওয়া, ৪. দাওয়াত করলে তা রক্ষা করা, ৫. হাঁচির জবাবে দোয়া করা। (সহিহ বোখারি : ১২৪০)
তবে অর্থবানদের দাওয়াত দেওয়া বা দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য করা নিন্দনীয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, যে অলিমায় কেবল ধনীদেরই আমন্ত্রণ জানানো হয় আর গরিবদের বর্জন করা হয়, সে অলিমার খাবার নিকৃষ্ট খাবার। আর যে আমন্ত্রণ রক্ষা করে না, সে তো আল্লাহ ও তার রাসুল (স.)-এর অবাধ্য হলো। (সহিহ বোখারি : ৫১৭৭)
আলোচ্য হাদিসে দুটি বিষয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়- এক. শুধু অর্থবিত্তের বিবেচনায় কাউকে দাওয়াত না দেওয়া, দুই. কেউ দাওয়াত দিলে তা রক্ষা করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো- কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যদি এমন পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয় যে উপহার ছাড়া সেখানে গেলে লজ্জিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে এমন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করলে কে দায়ী থাকবে? নিশ্চয়ই এমন পরিবেশ ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক মূল্যবোধবিরোধী। উপহার পাওয়ার জন্য দাওয়াত দেওয়া যেমন নিন্দনীয়, তেমনি উপহার দেওয়ার ভয়ে দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করাও নিন্দনীয়। আর গরিবের দাওয়াতও গ্রহণ করতে হবে- এটা ইসলামের শিক্ষা। হজরত রাসুলুল্লাহ (স.) দরিদ্র মানুষের দাওয়াত গ্রহণের ব্যাপারে বলেন, ‘আমাকে যদি (বকরির পায়ের) মাংসবিহীন চিকন হাড় খেতেও দাওয়াত করা হয়, তবু আমি সে দাওয়াত রক্ষা করব। (সহিহ বোখারি : ৫১৭৮)
নবী কারিম (স.) উপহার আদান-প্রদানে স্বতঃস্ফূর্ত সন্তুষ্টির শর্ত দিয়েছেন। সুতরাং সামাজিকতার চাপে যে উপহার আদান-প্রদান করা হয় তা উপহার বিবেচিত হবে না। নবী কারিম (স.) বলেছেন, ‘যে উপহার খুশি মনে দেওয়া হয় সেটাই শুধু বৈধ।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২০৭১৪)
ইসলামি সমাজব্যবস্থার মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো- তা লৌকিকতা ও বৈষম্যহীন। সেখানে সামাজিক সদাচরণ সবার প্রাপ্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং কোনো কিছুকে তার সঙ্গে শরিক করবে না। আর সদাচরণ করো মা-বাবার সঙ্গে এবং আত্মীয়-স্বজন, এতিম-মিসকিন, নিকট প্রতিবেশী ও দূর প্রতিবেশী, সঙ্গীসাথি, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের সঙ্গেও। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা আন নিসা : ৩৬)
ইসলামি শরিয়তে উপহার লেনদেনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উপহারটি সৎ ও ন্যায্য উদ্দেশ্যে হওয়া।