আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সদ্যসমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাপক ভরাডুবি হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো পরাজয় স্বীকার করতে নারাজ বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। বরং তিনি নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির যোগসাজশে অন্তত ১০০টি আসন ‘লুট’ হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
আজ মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিকেল ৪টায় কলকাতার কালীঘাটে যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলন করবেন মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জী। সে সময় তারা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে পারেন।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রথমবারের মতো রাজ্যে সরকার গঠনের পথে বিজেপি। ১৫ বছরের টানা শাসনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের এই বড় পরাজয়ের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
বিবিসি বলছে, নির্বাচনে মমতার তৃণমূল কংগ্রেসের পতনের প্রথম ও প্রধান কারণ নারী ভোটব্যাংকে ফাটল। এতদিন ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’ ও ‘সবুজ সাথী’-র মতো প্রকল্পের মাধ্যমে নারী ভোটারদের মধ্যে তৃণমূলের শক্ত অবস্থান ছিল। তবে নারী সুরক্ষার প্রশ্নে ব্যর্থতা, বিশেষ করে ২০২৪ সালে কলকাতায় কর্তব্যরত এক চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় বিচারের দাবিতে সংগঠিত আরজিকর আন্দোলন ভোটে অবশ্যই প্রভাব ফেলেছে। যার ফলে এবারের নির্বাচনে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি পানিহাটিতেও অভয়া'র মা বিজেপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, ভোটার তালিকার সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া। এতে প্রায় ৯০ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়ার ফলে তৃণমূল বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এই প্রক্রিয়ায় বহু ভুয়া ও মৃত ভোটারের নামও বাদ গেছে, তবুও এর রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট।
তা ছাড়া গত ১৫ বছরের দুর্নীতি, অপশাসন ও কর্মসংস্থানের অভাবও নির্বাচনের এ ফলাফলে ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘ শাসনে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত ছিল তৃণমূল সরকার। পাশাপাশি যুব সমাজের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটেছে এই নির্বাচনে। ফলে ভোটের আগে মাসিক ১৫০০ টাকা বেকার ভাতা চালু করেও সেই অসন্তোষ কমানো যায়নি।
এদিকে সাম্প্রদায়িক ভোটের সমীকরণে পরিবর্তনও এই নির্বাচনের পট পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছে। এতদিন মুসলিম ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল তৃণমূল এবারে হিন্দু ভোটের বড় অংশ হারিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিজেপির পক্ষে হিন্দু ভোটের ‘কনসলিডেশন’ ঘটেছে, যার ফলে মালদা ও মুর্শিদাবাদের মতো মুসলিম-গরিষ্ঠ জেলাতেও তারা বেশ কিছু আসন পেয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূলের ‘সফট হিন্দুত্ব’ কৌশলও কার্যকর হয়নি। রাজ্যের বেশিরভাগ হিন্দু বরং 'হিন্দুত্ববাদী' বিজেপিকেই বেছে নিয়েছেন।
এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা। এবারের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন এবং প্রশাসনিক রদবদলের ফলে ভোট প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে। অনেকের মতে, এর ফলে শাসক দলের প্রথাগত ‘অতিরিক্ত সুবিধা’ কমে গেছে, যা তৃণমূলের ক্ষতির কারণ হয়েছে।
সব মিলিয়ে এই নির্বাচনের ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, তৃণমূল কংগ্রেস কীভাবে এই ধাক্কা সামলে নিজেদের পুনর্গঠন করে এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করে।